উত্তর প্রদেশের সাম্ভল দাঙ্গার তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর ফের রাজনৈতিক তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দাবি করেছেন, এই রিপোর্ট প্রমাণ করেছে দাঙ্গা ছিল পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, যেখানে হিন্দু সমাজকে নিশানা করা হয়েছিল।
যোগীর অভিযোগ, সাম্ভলে জনসংখ্যার ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরে বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার সময় সাম্ভলে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫ শতাংশে, অন্যদিকে মুসলিমরা বেড়ে দাঁড়িয়েছেন প্রায় ৮৫ শতাংশে। তার ভাষায়, “পূর্ববর্তী শাসনে হিন্দুদের ওপর বারবার হামলা হয়েছে, দাঙ্গার মাধ্যমে এলাকা হিন্দুশূন্য করার চেষ্টা হয়েছে। তবে এখন ডাবল ইঞ্জিন সরকার ক্ষমতায়, এখানে আর তুষ্টিকরণের রাজনীতি নয়, চলবে সন্তুষ্টিকরণ। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সব নাগরিক সমানভাবে পাচ্ছেন, কিন্তু কেউ যদি জোর করে ডেমোগ্রাফি বদলাতে চায়, তাকে রাজ্য ছাড়তে হবে।”
কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের ১৯ নভেম্বর আদালতের নির্দেশে শাহী জামে মসজিদে এএসআই জরিপ চালানো হয়। এরপর ২৪ নভেম্বর দ্বিতীয় দফার জরিপ চলাকালীন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় চারজন নিহত ও অন্তত ২৯ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, বাইরের দুষ্কৃতীদের এনে সহিংসতা ঘটানো হয়েছিল এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি সক্রিয় ভূমিকা নেয়। অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালানকেও অশান্তির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রিপোর্টে সাম্ভলের অতীত সংঘর্ষের কথাও উঠে এসেছে—১৯৫৩ সালের শিয়া–সুন্নি সংঘর্ষ, ১৯৫৯ ও ১৯৬২ সালের সহিংসতা এবং ১৯৭৬ সালের মসজিদ কমিটি দ্বন্দ্ব—যা প্রমাণ করে এ জেলায় অতীতেও বহুবার বড় সংঘাত হয়েছে।
যোগী আদিত্যনাথ এই রিপোর্টকে সামনে রেখে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করেছেন। তার দাবি, “ইন্ডিয়া জোট আসলে এন্টি–ইন্ডিয়া জোট। তারা জাতপাত আর ধর্ম নিয়ে মানুষকে ভাগ করে, দেশের সম্মান খাটো করে। আমাদের সরকার মাফিয়া রাজের অবসান ঘটিয়েছে, উন্নয়নের পথ খুলেছে।”
অন্যদিকে, অল ইন্ডিয়া মজলিস ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM) নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসি এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তার প্রশ্ন, যদি দাঙ্গায় বাইরের লোকজন জড়িত থাকে, তবে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হলো কেন? তিনি অভিযোগ করেন, রিপোর্টে সরকারের নিরাপত্তাহীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা নেই।
ওয়াইসি আরও বলেন, “ভারতের ইতিহাস প্রমাণ করে দেশ হিন্দু–মুসলিম মিলেই তৈরি হয়েছে। বিজেপি বারবার জনসংখ্যার প্রসঙ্গ তুলে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে বিভাজনের রাজনীতি করছে। সাম্ভলের রিপোর্ট আসলে ভোটের রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্ভলের এই দাঙ্গা এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার ইস্যু নয়; বরং উত্তর প্রদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যোগী আদিত্যনাথ যেখানে মুসলিম সমাজকে দোষারোপ করছেন, সেখানে ওয়াইসি পাল্টা বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেছেন। ফলে সাম্ভলের সহিংসতা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।