ফররুখ আহমদের গল্পে সমাজ ও জীবনের ভাঙনের চিত্র
কবির পাঁচটি গল্পে সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক সংকট, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের শিল্পিত প্রকাশ
- আপলোড সময় : ০৩-১১-২০২৬ ০২:৫২:১২ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩-১১-২০২৬ ০২:৫২:১২ অপরাহ্ন
- ৪ মিনিট পড়ার সময়
- ৪৫ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত
বাংলা সাহিত্যে কবি হিসেবে পরিচিত ফররুখ আহমদের কথাসাহিত্যেও উঠে এসেছে ব্যক্তি ও সমাজের ভাঙন, নৈতিক অবক্ষয় এবং জীবনের নানা সংকট। সাহিত্যজীবনের শুরুর দিকে লেখা তার পাঁচটি গল্পে মানুষের অপূর্ণতা, সামাজিক অস্থিরতা ও ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতার চিত্র পাওয়া যায়। সংখ্যায় সীমিত হলেও গল্পগুলো বাংলা কথাসাহিত্যে তার সৃজনশীলতা ও স্বতন্ত্র লেখনীর পরিচয় বহন করে।
১৯৩৭ সালে বাংলা ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে কবিতা ও গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে ফররুখ আহমদের সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়। ওই বছর বুলবুল পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘রাত্রি’ সনেটটি তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা হিসেবে পরিচিত। একই বছরের ভাদ্র মাসে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্প ‘অন্তর্লীন’।
১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় তার মোট পাঁচটি গল্প প্রকাশিত হয়। এগুলো হলো ‘অন্তর্লীন’, ‘বিবর্ণ’, ‘মৃত বসুধা’, ‘যে পুতুল ডলির মা’ এবং ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’। এ সময়টি ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৩৭ সালে খুলনা থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৩৯ সালে আইএ পাস করেন। মূলত কলকাতায় অবস্থানকালেই তার কবিতা ও গল্প লেখার চর্চা বিকশিত হয়।
১৯৩৯ সালের পর ফররুখ আহমদ নিয়মিত গল্প লিখেছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে পরবর্তী সময়ে কথাসাহিত্য রচনার একটি অসমাপ্ত প্রয়াসের সন্ধান মেলে। ১৩৫৩ বঙ্গাব্দে মৃত্তিকা পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ সংখ্যায় ‘সিকান্দার শা-র ঘোড়া’ নামে তার একটি অসমাপ্ত গদ্য প্রকাশিত হয়। রচনাটির শেষে ‘ক্রমশ’ লেখা থাকলেও এর পরবর্তী অংশ আর প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে কবিতাই হয়ে ওঠে তার সাহিত্যিক প্রকাশের প্রধান মাধ্যম।
ফররুখ আহমদের পাঁচটি গল্পের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। প্রতিটি গল্পেই কোনো না কোনোভাবে ক্ষয়, হতাশা, অপূর্ণতা ও ভাঙনের বিষয় উঠে এসেছে। ‘মৃত বসুধা’য় গ্রামীণ সমাজের অবক্ষয়, ‘বিবর্ণ’ গল্পে নদীভাঙন ও ব্যক্তিজীবনের বিপর্যয়, ‘অন্তর্লীন’ গল্পে মাতৃত্বের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা এবং ‘যে পুতুল ডলির মা’ গল্পে পারিবারিক জীবনের অন্তর্লীন সংকট বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
‘মৃত বসুধা’ গল্পে সোনারগাঁয়ের বৃদ্ধ খোন্দকার রউফ সাহেবের জীবনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক। একসময় দৃঢ় ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী রউফ সাহেব ভোগবিলাসের কারণে নিজের জীবনকেই বিপর্যস্ত করেছেন। তার অতীত জীবনের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে গল্পে উঠে এসেছে একজন মানুষের পতন এবং তার সঙ্গে একটি সমাজের উৎপাদনশীলতা হারানোর চিত্র। গল্পের শেষ বাক্য ‘বসুধা ওখানে মৃত—উৎপাদিকা শক্তিহীন’ গ্রামীণ সমাজের স্থবিরতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। রউফ সাহেবের ব্যক্তিগত পতনের পাশাপাশি রাহেলা ও সুফিয়ার জীবনও এই অবক্ষয়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে।
‘বিবর্ণ’ গল্পে হাসিনা নামের এক নারীর ভালোবাসা, বিয়ে ও জীবনের পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে কাহিনি এগিয়েছে। এখানে আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙন কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, মানুষের স্বপ্ন ও জীবনের ভেঙে পড়ার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। গল্পের ভাষায় উপমা ও পুনরাবৃত্তির ব্যবহার এর বিষণ্ণ আবহকে আরও গভীর করেছে। ‘বিবর্ণ আকাশ আর বিবর্ণ আশাহীন মন’ ধরনের বর্ণনায় ফররুখ আহমদের কবিসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তার প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘অন্তর্লীন’-এ শাহরিয়ার ও রেহানার দাম্পত্যজীবনের মধ্য দিয়ে মানসিক সংকট ও অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। শাহরিয়ার কল্পনাবিলাসী হলেও তার সংসারে সন্তান না আসায় রেহানার মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। এই আকাঙ্ক্ষা শুধু সন্তান লাভের ইচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার মানসিক জগতের গভীর বেদনার সঙ্গে যুক্ত। গল্পের শেষ দিকে রেহানার মৃত্যু ও শাহরিয়ারের বিপর্যয় কাহিনিকে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
‘যে পুতুল ডলির মা’ গল্পে পারিবারিক জীবনের সংকট তুলে ধরেছেন লেখক ভিন্ন আঙ্গিকে। ডলির পুতুল নিয়ে খেলার মধ্য দিয়ে তার মায়ের অপূর্ণ মাতৃত্ববোধ, স্নেহ ও মানসিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে। শিশুর সাধারণ খেলনাটি ধীরে ধীরে মায়ের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়। গল্পের শেষ দিকে স্বপ্নে পুতুলের মুখে রহস্যময় হাসির উপস্থিতি সংসারের বাহ্যিক শান্তির আড়ালে থাকা অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’কে ফররুখ আহমদের সবচেয়ে পরিণত ও উল্লেখযোগ্য গল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কলকাতার রাতের পটভূমিতে হারুন, ওয়াজেদ ও সালমার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গল্পের কাঠামো গড়ে উঠেছে। হারুন ভবঘুরে বুদ্ধিজীবীসুলভ যুবক, ওয়াজেদ আদর্শবাদী কর্মী এবং সালমা সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত নারী। গল্পের শুরুতেই ‘শেষ রাত্রি’ বাক্যটির মাধ্যমে একটি গভীর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সংক্ষিপ্ত বাক্য, চিত্রকল্প ও চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে গল্পটিতে ফররুখের গদ্যশৈলীর পরিণত রূপ প্রকাশ পেয়েছে। সাহিত্য সমালোচক মান্নান সৈয়দের মতে, কবি হিসেবে পরিচিত ফররুখের গদ্যেও রয়েছে নিজস্ব নির্মাণশৈলী।
গল্পগুলোতে অবক্ষয়, হতাশা ও নৈতিক সংকটের প্রাধান্য থাকলেও ফররুখ আহমদকে কেবল হতাশাবাদী লেখক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ‘মৃত বসুধা’ ও ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’য় নির্বিচার ভোগবাদ ও নৈতিক দুর্বলতার সমালোচনা স্পষ্ট। তার গল্পে সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাবও লক্ষ করা যায়।
‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’ গল্পের হারুনের বিপ্লবী চিন্তা ও পরবর্তী সময়ে আদর্শ সম্পর্কে মোহভঙ্গের ঘটনা লেখকের প্রথম জীবনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কবি-কন্যার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, প্রথম জীবনে ফররুখ আহমদ উপমহাদেশের মানবতাবাদী কমিউনিস্ট নেতা এমএন রায়ের অনুসারী ছিলেন। গল্পের হারুনের বিপ্লবী রাশিয়ার প্রতি অনুরাগ এবং মহিলা সমিতির নেত্রী সালেমা বেগমের নৈতিক স্খলন সম্পর্কে জানার পর তার মোহভঙ্গের ঘটনাও এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগের অস্থির সময়ে রচিত এসব গল্পে আসন্ন সামাজিক বিপর্যয়ের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। মানুষের ভঙ্গুরতা, নৈতিক সংকট ও সমাজের অবক্ষয় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে একজন তরুণ লেখকের গভীর জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন ফররুখ আহমদ।
সব মিলিয়ে, ফররুখ আহমদের গল্পগুলো কেবল তার কবিজীবনের প্রাথমিক অনুশীলন নয়; বরং বাংলা কথাসাহিত্যে তার স্বতন্ত্র সৃজনশীলতারও পরিচায়ক। সীমিতসংখ্যক গল্পের মধ্যেও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সামাজিক বাস্তবতা ও জীবনের ভাঙনকে শিল্পিতভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। এসব রচনা বাংলা সাহিত্যে তার কথাসাহিত্যিক পরিচয় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।