শুধু আইনে সড়ক নিরাপদ হবে না, প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ: ইলিয়াস কাঞ্চন
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে জনসচেতনতা বেড়েছে, তবে দুর্ঘটনা কমাতে আইন প্রয়োগ, চালকের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
- আপলোড সময় : ২৩-১০-২০২৬ ১০:০৩:০৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৩-১০-২০২৬ ১০:০৩:০৩ অপরাহ্ন
- ৪ মিনিট পড়ার সময়
- ৩৩ বার পঠিত
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারানোর পর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)। তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বর্তমানে অসুস্থতাজনিত কারণে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ইলিয়াস কাঞ্চন দৈনিক যুগান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অগ্রগতি, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ন্যায়বিচার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সড়ক নিরাপদ হবে না; আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন: কয়েক দশক ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলন কতটা এগিয়েছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: আন্দোলনের ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। নিরাপদ সড়ক এখন আর শুধু একটি সংগঠনের দাবি নয়, বরং জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে জনসচেতনতা বাড়লেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন পুরোপুরি আসেনি। আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়ন, চালকের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস, সড়কের অবকাঠামো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশ্ন: আন্দোলনের শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমান সড়ক কি নিরাপদ হয়েছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। মানুষ আগের চেয়ে বেশি সচেতন, গণমাধ্যম বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরাও নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে। রাষ্ট্রও বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করেছে। তবে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারগুলো যখন স্বজন হারাচ্ছে, তখন কেবল অগ্রগতির কথা বলে সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন: কখনো কি মনে হয়েছে, আপনার আন্দোলন ব্যর্থ হচ্ছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: না। মানুষের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো আন্দোলনকে আমি ব্যর্থ মনে করি না।
প্রশ্ন: আপনার দেওয়া প্রস্তাব কি সরকার কখনো গ্রহণ করেছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: বিভিন্ন সময়ে আমাদের অনেক প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করেছে এবং কিছু বাস্তবায়নও হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল ও জেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখি। এ ছাড়া বুয়েটে দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, হাইওয়ে পুলিশ গঠন এবং ট্রমা সেন্টার স্থাপনের মতো উদ্যোগেও আমাদের দাবির প্রতিফলন রয়েছে।
প্রশ্ন: সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমাতে সরকারের কোন বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন?
ইলিয়াস কাঞ্চন: সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, নগর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহণ খাতের দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনাকে জেলা, উপজেলা ও নগর পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও স্থান চিহ্নিত করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয় এবং কাজ শেষ করার সময়সীমাও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চালক প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।
প্রশ্ন: সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর কিছুদিন শোক প্রকাশ করা হলেও পরে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। এর দায় কার?
ইলিয়াস কাঞ্চন: এ ক্ষেত্রে সবারই দায়িত্ব রয়েছে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্ঘটনার পর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গণমাধ্যমের কাজ শুধু দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ করা নয়; দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিরোধের উপায়ও তুলে ধরতে হবে। সাধারণ মানুষকেও ট্রাফিক আইন মানতে হবে। সড়কে একটি ভুলের কারণে নিজের পাশাপাশি অন্যের জীবনও বিপন্ন হতে পারে।
প্রশ্ন: নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করতে গিয়ে কি হুমকি বা বিরোধিতার মুখে পড়েছেন?
ইলিয়াস কাঞ্চন: আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে হুমকি, প্রতিরোধ ও বিরোধিতার মুখে পড়েছি। ২০১২ সালে আমার ছবিতে জুতার মালা পরানো হয়েছিল, ছবি পোড়ানো হয়েছিল এবং আমার গাড়িতেও আঘাত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে বাস টার্মিনালগুলোতে আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার ঘটনাও ঘটেছিল।
প্রশ্ন: সরকার নিরাপদ সড়কের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আইনও প্রণয়ন করে। বাস্তবায়নে ঘাটতি কোথায়?
ইলিয়াস কাঞ্চন: মূল সমস্যা হলো আইন কতটা নিয়মিত ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। আইন ভাঙার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য কঠোরতা থাকলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যদি দায় এড়িয়ে যেতে পারেন, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে না। এ জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তদন্ত, বিচার ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে কতটা ন্যায়বিচার পাচ্ছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: অনেক পরিবারই প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার পায় না। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু হলে পরিবারটি শুধু স্বজনকেই হারায় না, অনেক সময় পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও হারায়। তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া আর পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। এর পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা কি যথেষ্ট?
ইলিয়াস কাঞ্চন: নিরাপদ সড়কের বিষয়টি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিরোধের উপায় তুলে ধরতে আরও ধারাবাহিক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রয়োজন।
ইলিয়াস কাঞ্চনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি, দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপরই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
উৎস ও কৃতিত্ব: দৈনিক যুগান্তর। মূল সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এফ আই দীপু। প্রকাশিত হয়েছে ২২ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনটি মূল সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের ভিত্তিতে সম্পাদনা ও পুনর্গঠন করা হয়েছে; এটি নতুন বা নিজস্ব সাক্ষাৎকার নয়।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।