ইউরোপে বিক্ষোভের নেপথ্যে অর্থনৈতিক সংকট ও অসন্তোষ
আবাসনসংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ঘাটতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনঅসন্তোষ বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন কলাম লেখক আলী আহমাদ মাবরুর।
- আপলোড সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০৯:৪১:৫৮ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০৯:৪১:৫৮ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ২২ বার পঠিত
সংগৃহীত ছবি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য, আবাসনসংকট এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব আন্দোলনকে কেবল অভিবাসন বা ধর্মীয় পরিচয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করলে সংকটের প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যেতে পারে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিক্ষোভের কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত ‘ইউরোপে বিক্ষোভের নেপথ্যে’ শীর্ষক এক কলামে লেখক আলী আহমাদ মাবরুর এসব বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জনঅসন্তোষের ধরন এক নয়। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, কোথাও বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবার কোথাও দুর্নীতি ও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষকস্বল্পতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষের কথা উল্লেখ করেছেন লেখক। স্পেন ও পর্তুগালে আবাসনসংকট এবং বাড়িভাড়া বৃদ্ধি বিশেষ করে তরুণদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ইতালিতে মজুরি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। বেলজিয়ামে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যয় ও বাজেটসংকোচন এবং আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নও প্রতিবাদের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং জার্মানিতে সামরিক ব্যয় ও সামরিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে তরুণদের উদ্বেগের কথাও কলামে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হলে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। আয় বাড়ার তুলনায় আবাসন, খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়লে মানুষ অর্থনৈতিক অগ্রগতির সরকারি দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। একইভাবে শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থান ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ায়।
কলামে ইউরোপের বিক্ষোভের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় ও অভিবাসনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। লেখকের বক্তব্য, কোনো আন্দোলনে ফিলিস্তিনের পতাকা দেখা গেলেই সেটিকে ধর্মীয় উসকানি বা কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিচালিত আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসংগত নয়। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি অনেকের কাছে মানবাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে।
একইভাবে অভিবাসন নিয়ে নীতিগত আলোচনা প্রয়োজন হলেও ইউরোপের সব অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করা সমস্যার অতিসরলীকৃত ব্যাখ্যা। লেখকের মতে, অভিবাসীরা বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি ও পরিবহন খাতেও অবদান রাখছেন। তাই অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
লেখায় আরও বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী অভিবাসী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দায়ী করে জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এতে প্রকৃত সমস্যার সমাধানের বদলে সামাজিক বিভাজন ও পরিচয়ভিত্তিক বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিক্ষোভের সময় সহিংসতা ঘটলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন লেখক। তবে কিছু ব্যক্তির সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো আন্দোলনকে দায়ী করাও সমীচীন নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হামলার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
কলামের শেষাংশে ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রের সক্ষমতা, জনসেবার মান এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমাতে পারে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট যুক্ত হলে তরুণেরা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারেন।
সব মিলিয়ে, লেখক ইউরোপের বিক্ষোভের কারণগুলো সততার সঙ্গে চিহ্নিত করা, সরকার ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিভাজনমূলক প্রচারণার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
উৎস ও কৃতিত্ব: দৈনিক সংগ্রাম, ‘ইউরোপে বিক্ষোভের নেপথ্যে’, লেখক: আলী আহমাদ মাবরুর, প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬। এটি মূল মতামতধর্মী কলামের ভিত্তিতে সম্পাদিত ও পুনর্গঠিত প্রতিবেদন; লেখকের বিশ্লেষণকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সংবাদতথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।