স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চোখে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট, নিয়োগে দুর্নীতি ও তরুণদের মানসিক সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন
- আপলোড সময় : ২৭-১০-২০২৬ ১০:৩৯:০১ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৭-১০-২০২৬ ১০:৩৯:০১ অপরাহ্ন
- ৫ মিনিট পড়ার সময়
- ৪৬ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত
একজন শিক্ষার্থী জীবনের দীর্ঘ ১৭–১৮ বছর পড়াশোনা করে কাটিয়ে দেন একটি স্বপ্ন নিয়ে—বড় হয়ে দেশের সেবা করবেন, পরিবারের হাল ধরবেন, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় অনেকের সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। বাস্তবতার অদৃশ্য কোনো শক্তির হাতে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায় সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন। এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরাও।
ক্যাম্পাসে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলেন। কেউ শ্রেণিকক্ষে, কেউ গ্রন্থাগারে, আবার কেউ আবাসিক হল কিংবা ক্যাম্পাসের বাইরের আবাসস্থলে বসে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য। তাঁদের অনেকের স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া, কেউ ব্যাংকার, কেউ শিক্ষক, কেউবা অন্য কোনো সম্মানজনক পেশায় যুক্ত হয়ে পরিবার ও দেশের দায়িত্ব নেওয়া। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনই যখন কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন তাঁদের সামনে দাঁড়ায় কঠিন এক প্রশ্ন—এত বছরের পরিশ্রমের পরও কি নিশ্চিত হবে একটি কর্মসংস্থান?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২৭ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের বিষয়টিও বিশেষ উদ্বেগের। মূল লেখায় উল্লেখিত ৮৭ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত বেকারের দাবিটি অবশ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। এই পরিসংখ্যানগুলো দেশের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
প্রশ্ন হলো, দেশে একের পর এক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা বাড়ছে? প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সেই বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষে তাঁদের সবার জন্য কি পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে? সার্কুলার নেই, পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ নেই, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই—অথচ আছে পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের স্বপ্ন এবং টিকে থাকার তাগিদ।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার ব্যয়ের পাশাপাশি আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও বই কেনার খরচ বহন করতে হয়। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চশিক্ষা অর্জন শুধু মেধার লড়াই নয়, প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধও। কেউ টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগান, কেউ পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া তাঁদের জন্য আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তবু একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তাঁরা লড়াই চালিয়ে যান।
চাকরির বাজারে প্রবেশের পর শুরু হয় আরেক প্রতিযোগিতা। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও অনেকে লিখিত পরীক্ষায় টিকতে পারেন না; লিখিত পরীক্ষায় সফল হয়েও ভাইভা শেষে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ পান না। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েও চাকরি না পাওয়ার হতাশা তাঁদের পিছু ছাড়ে না। একটি পদের বিপরীতে শত শত, কখনো হাজারো প্রার্থী প্রতিযোগিতা করেন। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকের কাছে চাকরি পাওয়া হয়ে ওঠে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পথ।
এই প্রতিযোগিতার মধ্যে দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ চাকরিপ্রার্থীদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়। নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন প্রার্থীর অধিকার হরণ করে না; যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। চাকরির বাজারে ‘মামা-খালুর ক্ষমতা’ কিংবা অর্থের প্রভাবের ধারণা তরুণদের মধ্যে তৈরি হলে মেধা ও পরিশ্রমের প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
কর্মসংস্থানের অভাবে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার বিষয়টিও তরুণদের জন্য বেদনাদায়ক। দেশসেরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেও কেউ যদি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পান, তবে তাঁর হতাশা অস্বাভাবিক নয়। তবে অফিস সহায়ক কিংবা দিনমজুরের কাজকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই; প্রতিটি সৎ পেশারই মর্যাদা রয়েছে। সংকটটি পেশার মর্যাদায় নয়, বরং শিক্ষিত তরুণদের জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ বেছে নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ ও ন্যায্য মূল্যায়নের অভাবে।
বেকারত্বের প্রভাব শুধু আর্থিক সংকটে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কষ্ট, সহপাঠীদের কর্মজীবনে প্রবেশ করতে দেখা, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অনেকেই মানসিক চাপে ভোগেন। দীর্ঘদিনের হতাশা কখনো কখনো তাঁদের গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে আত্মহত্যার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে; সব ঘটনার জন্য বেকারত্বকে এককভাবে দায়ী করা যথাযথ নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যও প্রয়োজন এমন একটি বাস্তবতা, যেখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তাঁদের ভবিষ্যৎ কেবল অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়ন, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং তরুণদের দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো নয়, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের কার্যকর সংযোগ তৈরি করাও জরুরি।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী দিনের পর দিন গ্রন্থাগারে বসে চাকরির প্রস্তুতি নেন। কখনো আর্থিক সংকটের সঙ্গে লড়েন, কখনো নিজের ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে আবার বই খুলে বসেন। তাঁর চোখে থাকে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের জন্য কিছু করার প্রত্যয়। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বারবার বাধা এলে তাঁর কষ্ট শুধু ব্যক্তিগত থাকে না; তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থাননীতি ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
তরুণদের এই কষ্টের সমাধান হোক। মেধাবীরা তাঁদের যোগ্য জায়গায় পৌঁছানোর সুযোগ পান, দেশের সেবা করুন, পরিবারের দায়িত্ব নিন। কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন কেবল কর্মসংস্থানের অভাবে ভেঙে না যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা তরুণেরা যেন নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন—এটাই প্রত্যাশা।
আমার মাতৃভূমি এগিয়ে যাক। ঝরে না পড়ুক, হারিয়ে না যাক কোনো মায়ের মেধাবী সন্তান। স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান কমুক, প্রতিটি তরুণের মুখে ফুটে উঠুক আত্মবিশ্বাসের হাসি।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।