লাওসে চীনের নতুন সামরিক ঘাঁটি, বাড়ছে আঞ্চলিক উদ্বেগ
ভিয়েতনামের ওপর চাপ বাড়ানো থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক প্রভাব বিস্তার, রয়েছে চারটি সম্ভাব্য প্রভাব
- আপলোড সময় : ২০-১০-২০২৬ ০৯:৪৯:৫৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২০-১০-২০২৬ ০৯:৪৯:৫৯ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ১০ বার পঠিত
সংগৃহীত ছবি
বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে লাওসে নতুন সামরিক প্রশিক্ষণ ও সহায়তা স্থাপনা গড়ে তুলেছে চীন। ভিয়েনতিয়েনের কাছে বান কিউন বিমানবন্দরে লাওসের সঙ্গে যৌথভাবে স্থাপিত এই কেন্দ্রকে বিদেশে চীনের প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকৃত সামরিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর কৌশলগত চাপ বাড়তে পারে।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত সেপ্টেম্বরে এক ঘোষণায় স্থাপনাটির কথা জানায়। বেইজিংয়ের দাবি, এর মূল উদ্দেশ্য লাওসের বিমানবাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখা। তবে বিদেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সমালোচক চীনের এ ধরনের স্থাপনা গড়ে তোলাকে তার আগের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সিএনএনের সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে বান কিউন স্থাপনায় প্রায় দুই হাজার মিটার দীর্ঘ রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে এবং ২২টি উড়োজাহাজ রাখার উপযোগী পার্কিং এলাকা দেখা গেছে। রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্রে আটটি উড়োজাহাজ এবং দুই ডজনের বেশি সহায়ক যানবাহন দেখা গেছে। উড়োজাহাজগুলো চীন-পাকিস্তানের তৈরি হংডু জেএল-৮ প্রশিক্ষণ ও হালকা আক্রমণকারী বিমান হতে পারে, যা কে-৮ নামেও পরিচিত।
লাওসের বিমানবাহিনীর কাছে এ ধরনের উড়োজাহাজ রয়েছে। তবে স্থাপনাটিতে দেখা যাওয়া আটটি উড়োজাহাজের সবগুলোই দেশটির নিজস্ব কি না, তা নিশ্চিত নয়। লাওস নতুন করে উড়োজাহাজ কিনে থাকতে পারে, আবার কয়েকটি চীনেরও হতে পারে।
লাওসে নতুন স্থাপনাটি চীনের বিদেশে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ধারাবাহিকতার অংশ। ২০১৭ সালে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে প্রথম বিদেশি সামরিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে চীন। বেইজিং তখনও এটিকে সামরিক ঘাঁটির পরিবর্তে রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছিল। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত এই স্থাপনাটি লোহিত সাগরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর কৌশলগত অবস্থান তৈরি করেছে।
এ ছাড়া কম্বোডিয়ার রিয়াম নৌঘাঁটির উন্নয়নেও চীনের ভূমিকা রয়েছে। ২০২২ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘাঁটির কিছু অংশ চীনা সামরিক বাহিনীর একক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রথমদিকে চীন ও কম্বোডিয়া এ প্রতিবেদন অস্বীকার করলেও গত বছর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপনাটির উদ্বোধন করে। এরপর দুই দেশের যুদ্ধজাহাজ সেখানে গিয়ে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়।
রিয়াম নৌঘাঁটি থাইল্যান্ড উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। অন্যদিকে লাওসের বান কিউন স্থাপনা চীনের জন্য বিমান চলাচল ও সামরিক রসদ ব্যবস্থাপনার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে এ অঞ্চলে চীনের নৌ ও বিমান সহায়তা অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লাওসে নতুন স্থাপনা গড়ে তোলার অন্তত চারটি কৌশলগত প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকেরা। প্রথমত, ভিয়েতনামের পশ্চিমে অবস্থিত এই স্থাপনা দেশটির ওপর চীনের চাপ বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক ও সামুদ্রিক বিরোধ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, চীনের বিদেশি সামরিক স্থাপনায় এবার বিমানশক্তির বিষয়টি যুক্ত হলো। জিবুতি ও কম্বোডিয়ার স্থাপনাগুলো মূলত নৌবাহিনীকেন্দ্রিক। বান কিউন স্থাপনা চীনের বিমানবাহিনীকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থান তৈরির সুযোগ দিতে পারে। ভবিষ্যতে রানওয়ে সম্প্রসারণ করে নজরদারি বিমান বা বোমারু বিমান পরিচালনার উপযোগী করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। স্থলবেষ্টিত হলেও লাওসের দীর্ঘ ও সরু ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তৃতীয়ত, এই স্থাপনা বিদেশে সামরিক উপস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে চীনের ভিন্ন কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রচলিত সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে যৌথ প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা বা মানবিক সহায়তার কেন্দ্র হিসেবে স্থাপনা গড়ে তুলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে বেইজিং। এতে পশ্চিমা ধাঁচের পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি তৈরির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যয় এড়িয়েও একই ধরনের কৌশলগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক র্যাচেল ভ্যানডেনব্রিঙ্কের উদ্ধৃতি দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, বান কিউন স্থাপনার সিদ্ধান্ত চীনের কোনো স্পষ্ট সামরিক প্রয়োজন মেটানোর চেয়ে বিদ্যমান সুযোগ কাজে লাগানোর সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হতে পারে।
চতুর্থত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দীর্ঘদিনের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল চাপে পড়তে পারে। এ অঞ্চলের দেশগুলো চীনের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মাধ্যমে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করে আসছে। চীনের সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হলে এই কৌশল কত দিন কার্যকর রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে আঞ্চলিক দেশগুলোকে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।