শুধু রম্যলেখক নন, বিশ্বসাহিত্যের অনন্য গদ্যশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলী
ভাষার কারুকাজ, বিশ্বজ্ঞান, ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ও বৈচিত্র্যময় পর্যবেক্ষণে বাংলা গদ্যসাহিত্যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী।
- আপলোড সময় : ২৭-১০-২০২৬ ১১:২০:২৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৭-১০-২০২৬ ১১:২০:২৭ পূর্বাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ২৯ বার পঠিত
ছবি সংগৃহীত
বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমী লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীকে অনেকেই রম্যলেখক হিসেবে চেনেন। তবে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় কেবল রম্যরচনায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গদ্যে ভাষার নৈপুণ্য, বিশ্বসাহিত্যের তথ্য, ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিশে আছে। ফলে তাঁর রচনা শুধু সাহিত্যপাঠ নয়, বিশ্বকে জানারও এক অনন্য মাধ্যম।
১৯০৪ সালে জন্ম নেওয়া সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষাজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। সিলেট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন, আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তাঁর জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করে। কর্মজীবনেও তিনি কাবুলের শিক্ষাদপ্তর, বরোদা কলেজ, বগুড়া আজিজুল হক কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজের সঙ্গে পরিচয় তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা।
সৈয়দ মুজতবা আলীর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘দেশে বিদেশে’, ‘জলে ডাঙায়’, ‘ভবঘুরে ও অন্যান্য’ এবং ‘মুসাফির’। এসব বইয়ে ভ্রমণের বর্ণনার পাশাপাশি উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, খাদ্যসংস্কৃতি, মানুষের আচরণ, রাজনীতি ও ঐতিহ্য। তাঁর ভ্রমণসাহিত্য প্রচলিত বিবরণধর্মী রচনার গণ্ডি ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডারের সমন্বয়ে স্বতন্ত্র রূপ পেয়েছে।
তাঁর গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কথোপকথনধর্মী ও বৈঠকী ভাষাশৈলী। মনে হয়, লেখক সরাসরি পাঠকের সঙ্গে কথা বলছেন। কথ্য, আঞ্চলিক ও ঔপভাষিক শব্দের ব্যবহার তাঁর লেখাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। একই সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য, পুরাণ, ইতিহাস, ভূগোল ও লোককাহিনি থেকে তথ্যের স্বতঃস্ফূর্ত সংযোজন তাঁর রচনায় গভীরতা তৈরি করে। গল্পের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেওয়ার দক্ষতাও তাঁর লেখাকে পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থে আফগানিস্তান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি দেশটির প্রকৃতি, সামাজিক জীবন, কৃষি, খাদ্যাভ্যাস, অতিথিপরায়ণতা ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে তাঁর আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে ভারতবর্ষের সঙ্গে দেশটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পর্যন্ত। ফলে বইটি কেবল ভ্রমণকাহিনি নয়, একটি সমাজ ও সভ্যতাকে বোঝারও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক দলিল।
অন্যদিকে ‘জলে ডাঙায়’ গ্রন্থে জাহাজে বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি বিভিন্ন বন্দর, দেশ ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরেছেন। কলম্বো, জিবুতি, মালদ্বীপ, আদন, সোকোত্রা দ্বীপ, পোর্ট সাঈদ ও সুয়েজ বন্দরের প্রসঙ্গের পাশাপাশি তাঁর লেখায় এসেছে উপনিবেশবাদ, দাসপ্রথা, মানুষের আচরণ এবং ভ্রমণজীবনের নানা অভিজ্ঞতা। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ঘটনাকেও তিনি রস, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সাহিত্যিক তাৎপর্য দিয়েছেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনায় ভোজনসংস্কৃতি, আড্ডা, সংগীত, কবিতা, প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কও বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। তাঁর লেখায় কখনো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কখনো হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের কবিতা, আবার কখনো বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনযাত্রা একসূত্রে যুক্ত হয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য সাধারণ বিষয়কেও পাঠকের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরে।
তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় নিয়ে আলোচনায় মিত্র এন্ড ঘোষ প্রকাশিত রচনাবলির সপ্তম খণ্ডের ভূমিকায় অরুণ বসুর মূল্যায়ন উল্লেখযোগ্য। তিনি সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যকে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া আলীয়ানা’ বলে অভিহিত করেছেন। এই মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে তাঁর রচনায় ছড়িয়ে থাকা জীবন-অভিজ্ঞতা, বিশ্বজ্ঞান ও বিচিত্র তথ্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সৈয়দ মুজতবা আলী মরণোত্তর একুশে পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন। তবে তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের মূল ভিত্তি তাঁর নিজস্ব ভাষাশৈলী, বিস্তৃত পাঠ, বিশ্বভ্রমণ এবং মানুষ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা। রম্যরচনার পরিচিতির বাইরে তাঁর গদ্যসাহিত্যকে পাঠ করলে বাংলা ভাষায় বিশ্বকে দেখার এক সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান পাওয়া যায়।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।