৯৭ শতাংশ কাজ শেষ, তবু বাতিল বিআরটি প্রকল্প
ব্যয় বেড়ে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা; গাজীপুর-উত্তরা করিডরকে ছয় লেনের মহাসড়ক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
- আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৯:৫২:০৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৯:৫২:০৩ অপরাহ্ন
- ৫ মিনিট পড়ার সময়
- ২১ বার পঠিত
সংগৃহীত ছবি
৯৭ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পর গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ১৮ অক্টোবর নেওয়া এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে করিডরটি ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। এতে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে। পাশাপাশি সড়ক প্রশস্ত করতে আরও ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পের এতটা কাজ শেষ হওয়ার পর বাতিলের সিদ্ধান্তে এর সুফল-ক্ষতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০১২ সালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ এবং বাকি অংশ উড়ালপথ হওয়ার কথা ছিল। সড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে বিশেষ বাস চালু করে যানজট কমানো এবং যাতায়াতের সময় বাঁচানো ছিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী এ সেবা ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করা হয়েছিল।
কিন্তু ১৪ বছরেও প্রকল্পটি যাত্রী পরিবহণের জন্য চালু করা যায়নি। নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতা ও নানা ত্রুটির কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট, যাত্রীভোগান্তি এবং পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে। গাজীপুর-উত্তরা করিডর ব্যবহারকারী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় তিন দফা সংশোধনের পর বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় তা ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ খরচ হলেও বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় সমস্যা ছিল বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা। শুরুতে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত দীর্ঘ বাস চালুর পরিকল্পনা করা হয়। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস সংগ্রহ করা যায়নি।
বাস সংগ্রহের পাশাপাশি স্টেশন নির্মাণের নকশা নিয়েও জটিলতা দেখা দেয়। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসের দরজা বাম পাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশনগুলো তৈরি করা হয়েছিল ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের কথা বিবেচনায় রেখে। ফলে বিশেষ বাস চালু হলেও বিদ্যমান গণপরিবহণব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাস ব্যবহার করা হলে সেগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডরের বাইরে চলাচল করতে পারবে না।
ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তর, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পের কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নির্মাণকাজ চলার সময় ব্যস্ত সড়কে যানবাহন চলাচল সচল রাখার কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না। এ ছাড়া কয়েকটি পদচারী-সেতুর লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, কোথাও অবকাঠামোর অবস্থা নষ্ট হয়েছে।
প্রকল্প বাতিলের আগে এর কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। তাঁর প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে প্রকল্প বাতিল করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। তাঁর যুক্তি, বিআরটি চালু হলে গাজীপুরের যাত্রীদের বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে আবার অন্য বাসে উঠতে হতো। এভাবে বারবার যানবাহন বদল করা বাস্তবসম্মত নয়। এ ছাড়া প্রকল্পটি চালু করলেও আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে এবং করিডরে যানজটের কারণে শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্প বাতিলের আগে মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প বিবেচনা করা হয়েছিল। এগুলো হলো প্রকল্প বাতিল করা, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিআরটি বাস চালু করা, বিদ্যমান পথে বিশেষ বাসের পাশাপাশি বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া এবং বিআরটি পথ টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা। শেষ পর্যন্ত প্রথম বিকল্পটি বেছে নেয় সরকার।
তবে প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ দিয়ে বাস কিনে প্রাথমিক পর্যায়ে বিআরটি চালু করা সম্ভব বলে মনে করছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের অব্যবহৃত ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ দিয়েই মৌলিক বিআরটি সেবা চালু করা যেতে পারে। তুলনামূলক উন্নত বাস কিনতে আরও ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা এবং আধুনিক বৈদ্যুতিক বাস ব্যবহার করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিআরটি ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। গ্লোবাল বিআরটি ডেটার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯১টি শহরে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং প্রতিদিন সোয়া তিন কোটির বেশি যাত্রী এতে চলাচল করেন। ২০০০ সালের পর বিশ্বে বিআরটি ব্যবস্থার সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৮৩ শতাংশ। প্রতিবেশী ভারতের ১৩টি শহরে ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী চলাচল করেন।
আধুনিক বিআরটি ব্যবস্থায় বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন, আগাম টিকিট বা প্রিপেইড বোর্ডিং, প্ল্যাটফর্মের সমতলে যাত্রী ওঠানামা, বেশি ধারণক্ষমতার বাস এবং পরিবহণের সঙ্গে ভূমি ব্যবহারের সমন্বয় থাকে। এ ব্যবস্থা মেট্রো রেলের তুলনায় কম ব্যয়ে নির্মাণ করা যায় এবং ঘণ্টায় প্রায় ২০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে বলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দীন হাসান প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রকল্পটি চালু করা গেলে যাত্রীরা উপকৃত হবেন এবং দেশে দ্রুতগতির গণপরিবহণব্যবস্থার একটি কার্যকর উদাহরণ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে প্রকল্প বাতিল করে করিডরটি সব ধরনের যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত করতে হলে বিআরটি স্টেশন, র্যাম্প ও চলন্ত সিঁড়ি অপসারণের পাশাপাশি ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। এ খরচের পরিমাণ নিয়ে নিবন্ধে ১ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে আর্থিক ও পরিবহণগত সুবিধা-অসুবিধার হিসাব নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।