সংবিধান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, সংবিধান দিবস পালনে অনীহা কেন?
সংবিধানকে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের অভিন্ন ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছেন আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান।
- আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০৯:২৩:২০ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০৯:২৩:২০ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ২৭ বার পঠিত
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংবিধান নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও সংবিধান দিবস পালনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্ধারণকারী এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলের জন্য সরকারি স্বীকৃতিতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ দশক। ২০২২ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার ৫০তম বছরে ৪ নভেম্বর সংবিধান দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান তাঁর এক মতামতধর্মী লেখায় বলেছেন, সংবিধানকে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় বৈধতা প্রতিষ্ঠার দলিল হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। সংবিধান কোনো দলের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার মৌলিক ভিত্তি।
লেখকের মতে, সংবিধান থাকা আর সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। সাংবিধানিকতার মূল কথা হলো, সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকে কাজ করবে। নির্বাচিত সরকার কিংবা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সাংবিধানিক ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংবিধান প্রায়ই পারস্পরিক বৈধতা অস্বীকারের হাতিয়ার হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে সংবিধান নাগরিকদের অভিন্ন আশ্রয় হয়ে ওঠার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস পালনের উদাহরণ টেনেছেন লেখক। ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস পালিত হয়। অনুষ্ঠানে ক্ষমতার বিভাজন, আইনের শাসন এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মতো বিষয় আলোচিত হয়। লেখকের প্রশ্ন, অন্য দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এমন আয়োজন থাকলেও বাংলাদেশের সংবিধান দিবসকে জনপরিসরে প্রতিষ্ঠিত করতে একই ধরনের উদ্যোগ কেন দৃশ্যমান নয়।
তিনি মনে করেন, সংবিধান শুধু আইনজীবী, বিচারক বা রাজনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত নয়। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারীসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জানা প্রয়োজন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার অধিকারের সঙ্গে সংবিধানের সম্পর্ক কী।
এ জন্য বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবিধান পাঠ, সংসদে বিশেষ আলোচনা, গণমাধ্যমে সহজ ভাষায় সাংবিধানিক অধিকার ব্যাখ্যা এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত সংলাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
লেখায় সাংবিধানিক দেশপ্রেমের ধারণার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মূল কথা হলো, নাগরিকের আনুগত্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা নেতার প্রতি নয়; বরং গণতান্ত্রিক নীতি, মৌলিক অধিকার ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। সংবিধান সংশোধন বা এর কোনো বিধান নিয়ে বিতর্ক করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও তা হতে হবে সাংবিধানিক পদ্ধতি ও নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে।
লেখকের মতে, সংবিধান দিবসকে কেবল আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান বা সরকারি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি, ক্ষমতার বিভাজন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, তা পর্যালোচনার উপলক্ষ হওয়া প্রয়োজন।
সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে। লেখকের বক্তব্য, এই নীতির বাস্তব প্রতিফলনই হওয়া উচিত সংবিধান দিবসের প্রধান শিক্ষা। সংবিধানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার না বানিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহির অভিন্ন ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হওয়া দরকার ৪ নভেম্বরের মূল অঙ্গীকার।
সূত্র: প্রথম আলো, মতামত বিভাগ। লেখক: এম এম খালেকুজ্জামান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।