ইসলামি বইমেলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে কিছু আলোচনা
ইসলামি বইমেলা যেন দ্বীনি ইলম অর্জনের এক বিশাল সাম্রাজ্য। নানা ধরনের ইসলামি বই এক জায়গায় যদি কেউ পেতে চান, তার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ হলো ইসলামি বইমেলা। তাই কেবল দ্বীনি ভাই-বোন নয়, প্রতিটি মানুষের জন্যই ইসলামি বইমেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
- আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০৭:৫৫:০৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০৭:৫৭:০৭ অপরাহ্ন
- ৬ মিনিট পড়ার সময়
- ৪০ বার পঠিত
প্রতীকী ছবি- ( সংগৃহীত)
আরমিন ইসলাম অর্থী,
শিক্ষার্থী
রবিউল আউয়াল মাস জুড়ে বাইতুল মোকাররমে আয়োজিত ইসলামি বই মেলার পর্দা নেমেছে। এবারের মতো বইমেলা যদিও শেষ হয়েছে কিন্তু বইমেলার গুরুত্ব সম্পর্কে কি আমরা যথাযথ ভাবে সচেতন হতে পেরেছি? কিংবা জনসাধারণের মাঝে কি সচেতনতা সৃষ্টি করতে পেরেছি? নিজে সচেতন হওয়া কিংবা মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা- উভয় কাজের জন্যই দরকারি হলো বইমেলার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। তা না হলে নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করার পথে বাধা সৃষ্টি হয়।
ভালো ও উপকারি বই মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তোলে। আর সেটা যদি হয় ইসলামি বই, তাহলে অজানাকে জানার, নিজের অর্জিত জ্ঞানকে পরিপক্ক করে তোলার ক্ষেত্রে এটি হতে পারে অন্যতম একটি সহায়ক মাধ্যম। প্রয়োজনীয় নানা ধরনের জ্ঞান অর্জন থেকে শুরু করে কল্পনা শক্তির বিকাশ ঘটানো- ইসলামি বই পড়ে পাওয়া সম্ভব এমন নানা উপকারিতা। বই মানুষকে সাহায্য করে জ্ঞানকে বিকশিত করতে।
নানা ধরনের, নানা বিষয়ের ইসলামি জ্ঞান অর্জনের এক অভিনব মাধ্যম হলো ইসলামি বইমেলা। ইসলামি বইমেলার ঐ পরিসরের মধ্যেই একজন পাঠক হাদিস, ফিকহ, আক্বিদাহ, সীরাহ, ইতিহাস সহ নানা বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। কখনো তাজবীদের বই থেকে নিজের তিলাওয়াতকে আরও উন্নত করা, কখনো হাদিসের বই থেকে নিজের জীবনে এর প্রতিফলন ঘটানো, কখনো সীরাহর বই থেকে যেন সেই প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর আগের সাহাবীদের জীবন যাত্রাকে নিজের জীবনে প্রতিফলিত করার চেষ্টা।
বই মেলায় সমাহার ঘটে নানা ধরনের ইসলামি ইতিহাসের বইয়ের। এক্ষেত্রে এক জায়গায় অনেক বই পাওয়া যায় বলে সুযোগ থাকে অনেক বই এর মাঝ থেকে যাচাই-বাছাই করে একটি বই কিনে নেয়ার। যার কারণে ভালো-মন্দ যাচাই করে নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে বই কেনার সুযোগ থাকে পাঠকের কাছে।
ঘরে বসেই হাজারেরও বেশি বছর আগের ইসলামি শাসনামলে ফিরে যেতে চাইলে আমাদের প্রয়োজন ইসলামি ইতিহাসের বই। কেননা ইতিহাস সম্বলিত ইসলামি বই থেকে আমরা অবগত হতে পারি আমাদের ইসলামের স্বর্ণযুগ সম্পর্কে। খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামল, নানা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইসলামের বিজয়, দ্বীন প্রতিষ্ঠাসহ এমন আরও নানা বিষয়কে হৃদয় দিয়ে অবলোকন করতে ইসলামি ইতিহাসের বই হতে পারে আপনার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। সাড়ে ১৪০০ বছর আগের সেই সোনালি ইতিহাসকে ছুঁয়ে দিতে আমাদের সাহায্য করতে পারে ইসলামি ইতিহাসের বই। এছাড়া নবি মুহাম্মাদ ﷺ এর আগে আরও যারা নবি ও রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, তাদের সম্পর্কেও জানার সুযোগ তৈরি হয় ইসলামি বইমেলার মাধ্যমে।
মুমিন হিসেবে কুরআন মাজিদ সহিহ- শুদ্ধভাবে পড়তে পারা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা অনেকেই শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে জানি না। আর তার চেয়েও দুঃখের বিষয় হলো এই অপারগতা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের অনেকের মধ্যেই কোনো পদক্ষেপ নেয়ারও প্রবণতা নেই। এই তাজবীদ শেখার প্রাথমিক একটি পদক্ষেপ আপনি নিতে পারেন ইসলামি বইমেলা থেকেই। বইমেলায় আপনি পেয়ে যাবেন নানা ধরনের তাজবীদের বই। যাচাই-বাছাই করে কিনলে মাখরাজ, মাদ, গুন্নাহ সহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আপনি পেতে পারেন শুধু একটি বইয়েই। এমনকি সেখানে আপনি এমন তাজবীদের বইও পাবেন যেখানে আলাদাভাবে চিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন হারফের উচ্চারণ স্থান দেখানো হয়েছে।
যদি আমরা অ্যারাবিকে দক্ষ হতে চাই, তাহলে "এসো আরবী শিখি"র মতো বই গুলো হতে পারে আমাদের সহায়ক। কেবল এটি নয়, ইসলামি বইমেলায় আপনি পেয়ে যাবেন বেসিক থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আরবি শেখার নানা বই। যদি আপনি আরবি শেখার খুব শুরুর দিকে থাকেন, তাহলে ইসলামি বইমেলায় প্রাথমিক পর্যায়ের যে বইগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো হতে পারে আপনার জন্য ভালো অপশন। এভাবে অনেক বই থেকে পাঠক বাছাই করে নিজের শেখার লেভেল অনুযায়ী বই কিনতে পারেন।
আমরা জানি, ইসলামিক নানা গুরুত্বপূর্ণ বই রচিত হয়েছে উর্দু ভাষায়, তাই আরবির পর উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে আমাদের পক্ষে সেসব বই থেকে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। আর উর্দু ভাষায় রচিত অনেক বই পাঠকগণ পেয়ে যাবেন ইসলামি বইমেলায়। নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী পাঠকগণ এখান থেকে পছন্দ করে নিতে পারেন উর্দু ভাষায় রচিত ইসলামি ইতিহাসের বই, সাহাবিদের নিয়ে রচিত বই কিংবা আরও অন্য কোনো বিষয়ের পুস্তক।
কুরআনের অনুবাদ জানার জন্য আমাদের প্রয়োজন কুরআনের অনুবাদ সম্বলিত এবং ব্যাখা সহ একটি তাফসির। বই মেলায় আপনি পেতে পারেন নানা ধরনের তাফসির বই। যারা প্রথমবারের মতো তাফসির পড়ার পরিকল্পনা করছেন তারা শুরুতে মেলা থেকে বেছে নিতে পারেন, "তাফসিরে তাওযীহুল কুরআন" এর মতো ছোট তাফসিরগুলো। এরপর অগ্রসর হতে পারেন "তাফসিরে ইবনে কাসির" এর মতো তাফসিরগুলোর দিকে যেগুলোতে রয়েছে বিস্তারিত আলোচনা। আর যারা ইতিমধ্যেই ছোট কোনো তাফসির পড়ে শেষ করেছেন, তারা শুরুতেই মেলা থেকে ক্রয় করতে পারেন বিস্তারিত কোনো তাফসির গ্রন্থ।
মুমিনের জীবনযাত্রাকে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত করার জন্য সীরাহর কোনো বিকল্প নেই। একজন মুমিন স্বভাবতই সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করবে এবং এই সুন্নাহসম্মত জীবনযাপনের জন্য সীরাহর জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি বইমেলায় নানা ধরনের সীরাহ বিষয়ক বইয়ের সমাহার ঘটানো হয়। কোনো বইয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হয় নবি ﷺ এর জীবনবৃত্তান্ত আবার কোনো বইয়ে থাকে বিস্তারিত আলোচনা। এভাবেই বিক্রেতাগণ পাঠক কিংবা ক্রেতাদের জন্য আলাদা প্রকারের বই এর ব্যবস্থা রাখেন যাতে পাঠকগণ নিজ আগ্রহ অনুযায়ী বই বাছাই করে নিতে পারেন। "আর রাহিকুল মাখতুম" সহ বেশ কিছু সীরাতের বই বাংলাদেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
নবি ﷺ এর কথা ও কাজ সম্পর্কে আমরা জানতে পারি হাদিস থেকে। নবি ﷺ এর একেকটি হাদিস যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একেকটি পাথেয়। কোন কাজটি কীভাবে করব, কীভাবে আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করব, কীভাবে শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে বেঁচে থাকব- জীবন পথে চলার এমন নানা পদক্ষেপ সম্পর্কে আমরা জানতে পারি হাদিস থেকে। কীভাবে স্বলাত আদায় করব, কুরবানির নানা বিধান, হজ্জে কখন-কীভাবে শামিল হব- ইত্যাদি নানা বিষয় নবি ﷺ এর হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি। আর এই হাদিস গুলো সংকলিত করার মাধ্যমে আমাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে হাদিস এর বইগুলো। ইসলামি বইমেলা থেকে আমরা এই বইগুলো সংগ্রহ করে হাদিসের জ্ঞান অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের জ্ঞানভাণ্ডার কে সমৃদ্ধ করতে পারি।
কেবল বড়দের জন্য নয় কিংবা শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য নয়, ইসলামি বইমেলায় শিশুদের জন্যও নানা প্রকারের বই এর ব্যবস্থা রাখা হয়। যেমন- আল্লাহকে চেনা (আক্বিদাহ), ফিকহ, হাদিস ইত্যাদি বিষয়গুলো কখনো গল্পের মাধ্যমে, কখনো ছড়ার মাধ্যমে শিশুদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। এসব বইয়ে ব্যবহার করা হয় চমৎকার ইলাস্ট্রেশন এবং লেখাগুলোকেও রাখা হয় সহজবোধ্য। যার কারণে এসব বই শিশুদের মধ্যে পড়ার আগ্রহ তৈরি করে এবং এভাবেই শিশুরা ইসলামি জ্ঞান নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে শুরু করে। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুতোষ ইসলামি বইগুলো কেনা এবং তাদের মধ্যে ইসলামি বইগুলো পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। ছোটবেলার এই বুনিয়াদ শিশুদের পরবর্তী জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি বইমেলায় কেবল মুসলিমদের জন্যই বই এর ব্যবস্থা থাকে, বিষয়টি এমন নয়। বরং যারা অমুসলিম অর্থাৎ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী তাদের জন্যও বই পাওয়া যায় ইসলামি বইমেলায়। মূলত এর উদ্দেশ্য হলো ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের জানানো এবং তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া। এছাড়া এই বইগুলো পড়ার মাধ্যমে আমরা অমুসলিম ভাই-বোনদের দাওয়াত দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কেও জানতে পারি। তাই আমাদের উচিত দাওয়াহ সংক্রান্ত বইগুলো ইসলামি বইমেলা থেকে সংগ্রহ করা। এর ফলে আমরা নিজে দাওয়াত দেওয়ার তরিকা কিংবা পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে যেমন জ্ঞান অর্জন করতে পারব, একই ভাবে অমুসলিম ভাইদের এসব বই উপহার দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করতে পারব।
ইসলামি বইমেলা থেকে সার্বিক ভাবে উপকৃত হওয়ার জন্য কেবল নিজে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হলেই হবে না, পাশাপাশি অন্যকে সচেতন করার বিষয়েও ফিকির করতে হবে। এভাবে সকলে মিলে সচেতন হয়ে সার্বিক ভাবে, বৃহৎ পরিসরে ইসলামি বইমেলা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব। তাই আমরা চেষ্টা করব বেশি বেশি ইসলামি বই কিনতে, পড়তে এমনকি অন্যকে উপহার দিতে।
কোনো কিছুর প্রচার-প্রসারের জন্য এর মার্কেটিং পলিসি সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ বিষয়টি সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং পরিচিত করে তোলার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ইসলামি বইমেলার ক্ষেত্রেও তাই। প্রচার-প্রসার সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো যত শক্তিশালী হবে তত এর মার্কেটিং পলিসি জোরদার হবে এবং আরও বেশি মানুষের কাছে ইসলামি বইমেলা পৌঁছে যাবে।
সর্বোপরি নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। ইসলামি বইমেলাকে মাধ্যম বানিয়ে নিজে ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি অন্যকেও জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করতে হবে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।