রাষ্ট্রীয় শোক ও সাধারণ ছুটির দিন উপেক্ষা করে বিদ্যালয় খোলা রাখা এবং শিক্ষকদের উপস্থিত থাকতে বাধ্য করার অভিযোগে খুলনার খালিশপুরের বঙ্গবাসী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনকে বিক্ষুব্ধ স্থানীয় অধিবাসী ও শিক্ষকদের একাংশ অবরুদ্ধ করে লাঞ্ছিত করেছেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিলেও কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৩১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় শোক দিবস ও সাধারণ ছুটি ঘোষিত থাকলেও প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন প্রতিষ্ঠানটির নোটিস বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওই দিন স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং সব শিক্ষককে উপস্থিত থাকার নির্দেশ জারি করেন। সকালে এ নির্দেশে ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ শিক্ষক ও স্থানীয়রা স্কুল প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে উত্তেজিত উপস্থিতরা প্রধান শিক্ষককে স্কুল ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ করে শারীরিক ও মৌখিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। খবর পেয়ে খালিশপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
খালিশপুর থানার ওসি তৌহিদুর রহমান জানান, “ঘটনার পর উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ না করায় প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনকে আইনগত প্রক্রিয়ায় আটকে রাখার সুযোগ ছিল না, তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” তবে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ায় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে যাচাই-বাছাই শুরু করেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইং এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা (অনিক) পৃথকভাবে প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছেন। অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর কাজী মো. আবু কাইয়ুম স্বাক্ষরিত নোটিসে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা-সংক্রান্ত নির্দেশিকা ২০১৫ (পরিমার্জিত ২০১৮) অনুযায়ী বিষয়টির সুষ্ঠু যাচাইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিসে বলা হয়েছে, আগামী ৪ জানুয়ারি সকাল ১০টায় অনিক কার্যালয়ে সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সাইদুর রহমান বলেন, “রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে সরকার ঘোষিত ছুটি অমান্য করে স্কুল খোলা রাখার অভিযোগকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এজন্যই প্রধান শিক্ষককে ঢাকায় এসে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে, যাতে বিষয়টি নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও মূল্যায়ন করা যায়।” তিনি আরও জানান, তদন্তের পর প্রমাণ সাপেক্ষে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ৩০ ডিসেম্বর বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ শেষে এক শিক্ষকের জন্য দোয়ার আয়োজন করা হয় এবং টেস্ট পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী ফেল করেছে, তাদের সমস্যা চিহ্নিত করা ও ১ জানুয়ারি নতুন বই বিতরণের প্রস্তুতি নিতে ৩১ ডিসেম্বর কয়েকজন শিক্ষককে আসতে অনুরোধ করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, “আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাস নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি, শুধুমাত্র রেজাল্ট, বই বিতরণ ও শিক্ষক মিটিং-সংক্রান্ত কাজ ছিল। ক্লাস সিক্সের এক ছাত্রী ভালো রেজাল্ট করায় স্যারদের জন্য মিষ্টি এনেছিল—এ বিষয়েও আগে আমি জানতাম না। একটি প্রভাবশালী পক্ষ ইস্যুটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে পরিস্থিতি জটিল করার চেষ্টা করছে।”
ঘটনার পর এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির নিয়ম ও রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালনের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের সংবেদনশীল দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও লিখিত নির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি না হয়।
ডেস্ক রিপোর্ট