ভারতের বিহার রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সম্প্রতি শেরশাহবাদি মুসলিমদের ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি ও সহযোগী নেতাদের অভিযোগ, এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নাকি “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী”। এমন তকমা ঘিরে উদ্বেগ, বিভাজন ও রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে অঞ্চলে।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বুধবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক গবেষণামূলক প্রতিবেদনে জানায়, বিহারের কিশানগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া ও পুর্নিয়া অঞ্চলে বসবাসরত এই শেরশাহবাদি মুসলমানরা ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে আগত। ২০২৩ সালের বিহার সরকারের জনগণনা অনুসারে, এ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। স্থানীয়ভাবে তাদের “ভাটিয়া” নামেও পরিচিত। বাংলা, উর্দু ও হিন্দির সংমিশ্রণে তারা একটি অনন্য উপভাষা ব্যবহার করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে নির্বাচনের আগে ধর্মীয় মেরুকরণ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে “অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্তে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন” গঠনের ঘোষণা দেন। এর পর থেকেই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়ে।
বিহারের কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং এক জনসভায় বলেন, “বাংলাদেশ থেকে অনেক রাক্ষস এসেছে; আমাদের তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।” এই মন্তব্যের পরিসর ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেখানে বহু শেরশাহবাদি তরুণ নিপীড়ন ও ভুল পরিচয়ের আশঙ্কায় ভীত। কিশানগঞ্জের মোখতার আলম জানান, এক হিন্দু বন্ধুর “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” মন্তব্য তার মনে গভীর আঘাত সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (NRC) ইস্যুর মতো নতুন করে বিহারে একই পদক্ষেপের প্রস্তাব বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বহন করছে। ২০১৯ সালে আসামে প্রায় ২০ লাখ মানুষ তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন, যাদের বড় অংশই মুসলিম। বিহারে মুসলিম জনসংখ্যা এখন প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ, যা রাজ্যের মোট জনগোষ্ঠীর ১৭ শতাংশ।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সীমান্তাঞ্চলে অনুপ্রবেশ ইস্যু তুলে বিজেপি আসলে ভোটব্যাংক বিভাজন ঘটাতে চাইছে। বেঙ্গালোরের আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল হোসেনের মতে, সীমান্তের উন্নয়ন-অভাবজনিত সমস্যাকে ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা মুসলিম সমাজকে ক্রমেই প্রান্তিক করে তুলছে। এর প্রভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্কেও দেখা দিচ্ছে অদৃশ্য দূরত্ব—যেখানে মুসলিম পরিচালিত প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকছেন অনেক হিন্দু নাগরিক।
সীমান্ত অঞ্চলের এই ক্রমবর্ধমান বিভাজন নিয়ে স্থানীয় মুসলিমরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “আমরা ভারতীয় নাগরিক হয়েও বারবার নাগরিকত্ব প্রমাণ দিতে দিতে ক্লান্ত।”
ডেস্ক রিপোর্ট