ইউরোপ বড় ধরনের সংকটে আছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে (ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্রাটেজি) বলা হয়েছে, ইউরোপ যদি সতর্ক না হয় তবে আগামী ২০ বছরের মাঝে তারা ‘পশ্চিমা’ পরিচয় হারিয়ে বসবে। খবর বিবিসি’র
ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এই নিরাপত্তা কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক পরিকল্পনা, সামরিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা কেমন হবে, তা তুলে ধরেছে। ৩৩ পৃষ্ঠার নথিতে ট্রাম্প তাঁর দৃষ্টিতে বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন এবং লক্ষ্য বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করবে, সে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
এই নথিতে ট্রাম্প ইউরোপের জন্য কয়েকটি বড় ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন—অভিবাসন, জন্মহার কমে যাওয়া, পরিচয়ের সংকট ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাকে তিনি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের দাবি, এই প্রবণতা চলতে থাকলে কিছু ইউরোপীয় দেশ ভবিষ্যতে আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য মার্কিন মিত্র নাও থাকতে পারে এবং ইউরোপিয় মহাদেশ একসময় নিজেকেই ‘অচেনা’ মনে করবে।
ট্রাম্প নথিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘একটি রোডম্যাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং প্রশাসনের ভাষ্যে এটি আমেরিকাকে ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মহান ও সফল দেশ’ হিসেবে ধরে রাখতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ বছরের মধ্যেই ইউরোপের সভ্যতাগত ভিত্তি ও পশ্চিমা পরিচয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউরোপের শীর্ষ নেতারা ও বহু গণমাধ্যম এই ভবিষ্যদ্বাণী ও ভাষ্যকে ভালোভাবে নেয়নি; তাদের মতে, জাতিসংঘে দেওয়া ট্রাম্পের আগের বক্তৃতার মতোই এখানে আবারও পশ্চিম ইউরোপের অভিবাসননীতি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নীতির কড়া সমালোচনা উঠে এসেছে। আগেরবার তিনি অভিবাসন ও পরিবেশবান্ধব নীতিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বলে আক্রমণ করেছিলেন, এবার নথিতে সরাসরি ইউরোপের ‘সভ্যতাগত বিলুপ্তি’র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে জার্মানি বিষয়টি একেবারেই মানতে পারছে না। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ভাডেফুল বলেছেন, জার্মানির ‘বাইরের পরামর্শের প্রয়োজন নেই’; তার ভাষায়, (ন্যাটো) জোটে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, তবে জোটের আলোচনা মূলত নিরাপত্তানীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা মুক্ত সমাজের সংগঠনের মতো প্রশ্ন এসব কৌশলগত নথির অংশ হওয়া উচিত নয়, অন্তত জার্মানির ক্ষেত্রে।
প্রথা অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা প্রতি মেয়াদে অন্তত একবার এমন আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেন, যা ভবিষ্যতের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা বাজেট ও সামরিক পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের নথি বিশ্বকেও ইঙ্গিত দেয়, পরবর্তী সময়টায় হোয়াইট হাউস আসলে কোন অগ্রাধিকারগুলো সামনে রেখে এগোতে চায়।
ট্রাম্পের এই কৌশলগত নথিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অতিরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার অভিযোগও আনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বর্তমান অভিবাসন নীতি সামাজিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে সেন্সরশিপ জোরদার হচ্ছে, যা ইউরোপের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে শুধু সমালোচনা নয়, নথিতে বিভিন্ন ‘দেশপ্রেমিক ইউরোপীয় দল’-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ইউরোপে জাতীয়তাবাদী ও সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক এই রাজনৈতিক উত্থানকে তারা নিজেদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে।
এ ছাড়া নথিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ও তাতে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া নিয়েও মন্তব্য করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে ইউরোপে ‘আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি’ রয়েছে এবং ইউরোপ–রাশিয়া সম্পর্ক পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলে এই নিরাপত্তা কৌশলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট