রোববার (১৬ আগস্ট) প্রকাশ্যে আসা একটি পডকাস্টে বেন-গভির এসব কথা বলেন। গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি বন্দি থাকা সাবেক ইসরায়েলি নাগরিক রোম ব্রাসলাভস্কির সঙ্গে ওই পডকাস্টে কথা বলেন তিনি। পরে ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেন-গভিরের বক্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বেন-গভির বলেন, গাজায় এমন মানুষও রয়েছেন, যারা বেঁচে থাকার যোগ্য নন। তাদের বেঁচে থাকা উচিত নয় এবং তারা ‘মানুষও নন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় গাজায় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানোর পক্ষে অবস্থান জানান ইসরায়েলের এই কট্টরপন্থি মন্ত্রী।
বেন-গভিরের এমন বক্তব্য তার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ও চরমপন্থি মন্তব্যেরই সর্বশেষ উদাহরণ। তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ইসরায়েলের পুলিশ ও কারাগার ব্যবস্থার দায়িত্বে রয়েছেন।
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর নির্বাচন সামনে রেখে বেন-গভিরের রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়ছে।
আল জাজিরা বলছে, বর্তমান ‘যুদ্ধবিরতির’ আওতায় গাজায় সামরিক হামলা কমিয়ে আনার বিষয়ে নেতানিয়াহু যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারও বিরোধিতা করেন বেন-গভির। তিনি বলেন, যারা ওই মুহূর্তে সরাসরি হুমকি নয়, তাদের বিরুদ্ধেও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড আবার শুরু করা উচিত।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর সরাসরি তার কোনও আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব নেই এবং তিনি নিজে কোনও হামলার নির্দেশ দিতে পারেন না। তবে তিনি দেশটির নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্য। এই মন্ত্রিসভায় জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা যুদ্ধ ও নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
ইসরায়েলে সম্প্রতি সামরিক আদালতে ইসরায়েলিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন কার্যকর হয়েছে। ব্রাসলাভস্কি বেন-গভিরকে বলেন, তিনি চান বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তাকে নিজে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হোক।
ব্রাসলাভস্কি বলেন, ‘আমার একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ আছে। আমি সত্যিই আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলছি, আমাকে তাদের ফাঁসি দেয়ার দায়িত্ব দিন’।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি দড়ি চাই না; আমি বন্দুকের ট্রিগার চাই। নিজের হাতে ইসরায়েলে থাকা প্রতিটি সন্ত্রাসীকে আমি মৃত্যুদণ্ড দেব।’
জবাবে বেন-গভির বলেন, ব্রাসলাভস্কির এই ইচ্ছা পূরণ করতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। এ জন্য প্রয়োজনে ‘পুরো বিশ্বকে ওলটপালট’ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
আলোচনায় বেন-গভির গাজার ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সেখান থেকে চলে যেতে উৎসাহিত করারও আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষে মত দেন তিনি। ব্রাসলাভস্কিকে তিনি বলেন, গাজার পুরো ভূখণ্ডকেই তিনি ‘আমাদের’ বলে মনে করেন। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে একই মন্তব্য করেছেন বেন-গভির।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের ব্যাপক, জোরপূর্বক বা পরিকল্পিতভাবে মানুষকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনা জাতিগত নিধনের শামিল হতে পারে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
আল জাজিরা বলছে, বেন-গভিরের এসব মন্তব্য কয়েক দশক ধরে চলে আসা তার চরমপন্থি অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। মূলত কিশোর বয়সে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত কাহানিস্ট জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ইসরায়েলি মন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রাণঘাতী হামলায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডকে নিয়মিত শাস্তি হিসেবে চালুর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। ইসরায়েলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে আরও খারাপ করার বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যে গর্ব করেছেন।
তার এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হলেও এখন পর্যন্ত তাকে বড় কোনও পরিণতির মুখে পড়তে হয়নি। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা তার কর্মকাণ্ডে কোনও প্রভাব ফেলেনি।
সূত্র: আল জাজিরা