অপ্রতিমের মরদেহে মাথার গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, কিছু ক্ষত মৃত্যুর পর তৈরি হয়ে থাকতে পারে। শুক্রবার রাতে শিয়াল মরদেহ টানাটানি করেছিল। এ বিষয়ে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যও পর্যালোচনা করছে পুলিশ।
তবে এরমধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পাঁচ হাজার টাকা ‘ধার’ করার কথা। তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আরেকটি বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ঘাতক মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ অপ্রতিমের বাবার মোবাইল সরঞ্জামাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারিম্যান। মাত্র ১৬ দিন আগে সে চাকরিতে যোগ দেওয়া সেই ফাহাদ অপ্রতিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। সম্প্রতি অপ্রতিম সেই টাকা ফেরত চাইছিল।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ নিয়ে অপ্রতিমের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে থাকতে পারে ফাহাদ। এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।
উল্লেখ্য, ফাহাদকে ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ফাহাদ ঘটনার দিন নিজের মোবাইল সঙ্গে নেয়নি। পরিবর্তে পরিবারের অন্য একজনের মোবাইল নিয়ে বের হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি ধরা না পড়ে, সে জন্যই এমনটি করা হয়েছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের দিন শুক্রবার দুপুর তিনটার দিকে অপ্রতিম আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। তার আগে জুম্মার নামাজ পড়ে সে বাসায় ফেরে। বাবা তাকে ভাত খাইয়ে দেন। খেয়েই বেড়িয়ে পড়ে সে। মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে তাকে বাসা থেকে বের করে আনে তুহিন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সেদিন অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটিতে বারবার ম্যাসেজ পাঠাচ্ছিলেন তুহিন। বাসা থেকে বের হতে বলছিলেন। একপর্যায়ে বলা হয়, অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি দিয়ে তারা টিকটকের জন্য ভিডিও বানাবেন, ছবি তুলবেন। এরপরই রাজি হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান অপ্রতিম।
পুলিশের ভাষ্য, বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি ধরা পড়ে। ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে, কথা বলছে। তাদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে যেতে দেখা গেছে। অন্য একটি ফুটেজে চারজনকেই একসঙ্গে পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এরপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাতেও বাসায় না ফেরায় ফাহাদকে ফোন করে ডেকে এনে বিষয়টি জানান অপ্রতিমের বাবা। কোথায় গেছে, খুঁজতেই তাকে আনা হয়। সে তখন তাদের ফেসবুক গ্রুপে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি লিখে দেয়। এরমধ্যে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ হাতে আসে অপ্রতিমের পরিবারের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও তার মায়ের সহকর্মীরা তা সংগ্রহ করে।
সিসিটিভি ফুটেজে যাকে অপ্রতিমের সাথে দেখা যাচ্ছে সে কে জানতে চাইলে তুহিনকে সহজেই চিনিয়ে দেয় ফাহাদ। পরে ফাহাদকে বলা হয় তুহিনকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করতে অপ্রতিমকে দেখেছে কিনা? ফাহাদের সাথে মোবাইল ফোনের কথোপকথনে তুহিন জানায়, অপ্রতিম তার কাছে আসেনি। তখন রাত ১০টা হবে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে গেছে।
পরদিন শনিবার সকালে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী তুহিন ও সন্দেহভাজন অপর গ্রেপ্তার সিয়াম (১৯) মোটরসাইকেলে চড়ে অপ্রতিমদের বাসায়ও আসে। তার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে। তাদের সান্ত্বনাও দেয়।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, শনিবার সকালে বাসায় এসে তুহিন স্বাভাবিক আচরণ করলেও নানা প্রশ্নে একটু রিয়েক্ট করে সিয়াম। পরে দুপুরে মরদেহ উদ্ধারের খবর আসার পর ঘটনাস্থলে ফাহাদকে সাথে যেতে বললে শরীর খারাপ লাগছে বলে সে চলে যায়।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, পরদিন শনিবার খোঁজখুঁজির সময় অপর ঘাতক কামরুলকেও তারা দেখেননি। কামরুলকে তারা চেনেনও না। কামরুল মূলত তুহিনের বন্ধু। হত্যার আগে তুহিন ফাহাদের মতো তাকেও ডেকে সঙ্গী করে।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে সেদিন রাত ৯টার দিকে প্রায় দেড় ঘণ্টা সিয়ামের সঙ্গে আড্ডা দেয় তুহিন। এ সময় তুহিন সিয়ামকে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান। এরপরও সিয়াম বিষয়টি গোপন রাখায় তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।