র্যাব বিলুপ্তির পর ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নামে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। নতুন আইনে গঠিত হলেও বাহিনীটির নেতৃত্ব, জনবল, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, অবকাঠামো, ব্যাংক হিসাব এবং কার্যক্রমের বড় অংশ আগের কাঠামোতেই রয়েছে। পরিবর্তনের প্রধান দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহিনীর নাম, আইন, লোগো, পোশাক ও পতাকায় পরিবর্তনের উদ্যোগ। বর্তমানে এসআরবির বিধি প্রণয়নের কাজ চলছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬ এর অধীনে নতুন বাহিনীটি পুরোনো এপিবিএন আইনগত কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসেছে। নতুন আইনে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেফতার, জব্দ, হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
এসআরবির নেতৃত্ব, জনবল ও অবকাঠামোর বড় অংশ র্যাব থেকে স্থানান্তরিত হওয়ায় বাহিনীটির কার্যক্রমে কতটা মৌলিক পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। নতুন আইনেও সশস্ত্র বাহিনী থেকে সদস্য নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো জনবল ও অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রায় একই ধরনের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা বহাল থাকায় শুধু নাম ও আইনি কাঠামো পরিবর্তন কতটা কার্যকর পরিবর্তন আনবে, তা এসআরবির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন আইনের তদারকি ও জবাবদিহির বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে অতীতে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, আগের বিতর্কিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস দমন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় এসআরবি কাজ করবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, নাম পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার হওয়ার সুযোগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বাহিনীর কার্যক্রমও যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের দাবি, কাগজে র্যাব বিলুপ্ত হলেও এসআরবি মূলত একই বাহিনীর নতুন কাঠামো। তার মতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসআরবিকে র্যাবের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে এবং বাহিনীটির ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ওপরই এর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে।
অন্যদিকে এসআরবির মহাপরিচালক হাসান হাবীব পলাশ বলেন, নাম পরিবর্তনের পরও কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি এবং নতুন আইনের কারণে কাজের গতি ও জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং বিদেশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে তারা আশাবাদী।
২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও তৎকালীন বিডিআরের সদস্যদের সমন্বয়ে র্যাব গঠন করা হয়। শুরুতে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বাহিনীটির ভূমিকা প্রশংসিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও হেফাজতে নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং বাহিনীটির কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর র্যাবের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে র্যাবের পরিবর্তে নতুন আইনি কাঠামোয় এসআরবি কার্যক্রম শুরু করেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসাবে, ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের সময় দেশজুড়ে ৪৬৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এবং ৬৭৭ জনকে গুম করা হয়। ২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত ছিল।