নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিতে পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় সংস্কার
আন্তর্জাতিক মানের তথ্যব্যবস্থা গড়তে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার
- আপলোড সময় : ০৮-১১-২০২৬ ০৯:২৬:০৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-১১-২০২৬ ০৯:২৬:০৯ অপরাহ্ন
- ৪ মিনিট পড়ার সময়
- ১৬ বার পঠিত
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সংগৃহীত ছবি
দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র তুলে ধরতে পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নীতিনির্ধারণ, গবেষণা ও সরকারি সেবা কার্যক্রমে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সবার জন্য সহজলভ্য করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মিলনায়তনে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান: টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’ প্রতিপাদ্যে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং বিবিএস যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ড. তিতুমীর বলেন, গত ১৭ বছরে প্রকাশিত অনেক পরিসংখ্যান দেশের প্রকৃত পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটায়নি। সরকার এখন এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হবে এবং দেশের বাস্তব চিত্র উঠে আসবে।
পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সংস্কারে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এগুলো হলো মানসম্মত ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জননীতি ও সরকারি সেবা কার্যক্রম জোরদার করা এবং উন্মুক্ত তথ্যনীতি চালুর মাধ্যমে সরকারি তথ্য সহজলভ্য করা।
মানসম্মত পরিসংখ্যান তৈরির বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে স্বীকৃত বৈশ্বিক মান অনুসরণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলছে। অতীতের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বিভিন্ন অসংগতি ও ঘাটতিও চিহ্নিত করা হয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনসহ (জিডিপি) গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে, যাতে পরিসংখ্যানে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয়।
মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আধুনিকায়নের কথাও জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে ভূস্থানিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং কম্পিউটার-সহায়তায় ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার (ক্যাপি) পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহকারীদের অবস্থান যাচাইয়ের পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক তথ্যের নির্ভুলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
তিতুমীর বলেন, ‘পরিসংখ্যান তৈরি বা বানানো যাবে না, তা সংগ্রহ করতে হবে।’ তথ্য সংগ্রহে স্বচ্ছতা ও পদ্ধতিগত শুদ্ধতা বজায় রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। অতীতের তথ্যের অসংগতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একসময় সরকারি হিসাবে দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার দেখানো হয়েছিল। অথচ প্রকৃত সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার।
সংস্কারের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, সরকারি নীতিনির্ধারণ ও সেবা কার্যক্রম তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে চায় সরকার। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দেওয়া এবং অযোগ্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো ভুলের কারণে সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হয়েছে।
প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রক্সি মিনস টেস্টসহ (পিএমটি) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে যোগ্য নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপকারভোগী নির্বাচনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) গড়ে তোলার কাজ চলছে। এর আওতায় জনসংখ্যা নিবন্ধন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হবে।
সংস্কারের তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে উন্মুক্ত তথ্যনীতি চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিতুমীর। তিনি বলেন, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান যেন নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য সহজে ব্যবহার করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। তথ্য সহজলভ্য হলে একাডেমিক গবেষণার পরিধি বাড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান উন্নত হবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি জোরদার হবে।
দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে অপতথ্য ও ভুল ব্যাখ্যা মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, সহজলভ্য ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য না থাকলে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়। পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সংস্কার সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহির উদ্দিন স্বপন এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিবিএসের পরিচালক কবির উদ্দিন আহাম্মদ। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান সমিতির সভাপতি সৈয়দ শাহাদাত হোসেন এবং বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।
সংস্কার বাস্তবায়নে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে ড. তিতুমীর বিবিএস এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। চলমান উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে নির্ভরযোগ্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।