রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করা রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’ একপর্যায়ে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে ২৭ বছর বয়সী এই তরুণের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি আবারও আলোচনায় এসেছেন। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
গত ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেফতার করা হয়। মোহাম্মদপুর থানায় তার বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি হত্যা, সাতটি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক ও ১৩টি মাদকের মামলা রয়েছে। প্রিজন ভ্যান থেকে পালানোর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পাঁচ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনাবাড়ী থানায় একটি মামলাও করা হয়েছে।
পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে পিচ্চি রাজা জানান, অপরাধ জগতে জড়ানোর আগে তিনি পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। পরে গ্যাস পাম্পে চাকরি নেন। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টাকা আয় হলেও একটি ঘটনায় চাকরি হারিয়ে তিনি আবার জেনেভা ক্যাম্পে ফিরে আসেন। ২০১৮ সালে ক্যাম্পে পুলিশের অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে কোনো মাদক না পাওয়ার দাবি করলেও ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ৫১ পিস ইয়াবার মামলা হয়। এটিই তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা বলে তিনি পুলিশকে জানান।
প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে তিনি মাদক বিক্রি শুরু করেন বলে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। শুরুতে অল্প পরিমাণ মাদক কিনে বিক্রি করতেন এবং প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টাকা আয় করতেন। পরে আবার কারাগারে গিয়ে সেখানে বিভিন্ন অপরাধীর সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ধীরে ধীরে মাদক ব্যবসায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, ২০১৪ সালের পর অল্প বয়সেই জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সঙ্গে যুক্ত হন রাজা। একই সময়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। ফলে ক্যাম্পের অপরাধজগতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০২০ সালে ইশতিয়াক মারা যাওয়ার পর ক্যাম্পের একটি অংশের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ রাজার হাতে আসে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে।
পরে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে ক্যাম্পে সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে পিচ্চি রাজার বিরোধ তীব্র হয়। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, লাইনম্যান নিয়োগ, অর্থ আদায় ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে পিচ্চি রাজা দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখান থেকেই ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। এসব ঘটনায় বুনিয়া সোহেলের নামও উঠে আসে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে—এ বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি পিচ্চি রাজা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে সম্পদ গড়ে তোলারও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে এ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার শ্বশুর খোরশেদ, শালা নয়ন ও ফুফাতো ভাই রনিসহ কয়েকজন আত্মীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। এসব সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ২৫ থেকে ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
পিচ্চি রাজার সঙ্গে মাদক কারবার ও অন্যান্য অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে আদি, নবাব, শাহজাদা, ফাইজান, বেলুন, রুবেল, রনি, নাটা সুমন, সুজন, ব্যাটারি কামরান, হীরা ও মঈন পিচ্চিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তারা মাদক সরবরাহ, অর্থ আদায়, দখল এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর কাজে জড়িত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো অপরাধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবে যোগাযোগ তৈরি করে পরে সেই পরিচয়কে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, কে সোর্স আর কে সোর্স নয়, সেটি পুলিশের কাছে মুখ্য বিষয় নয়; কেউ অপরাধী কি না, সেটিই প্রধান বিষয়। তিনি জানান, ক্যাম্পের অপরাধীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে।
এদিকে, প্রিজন ভ্যান থেকে পালানোর পর দুদিন পেরিয়ে গেলেও পিচ্চি রাজার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় মামলা হয়েছে। থানার ওসি ইফতেখার হোসেন জানান, উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ মজুমদার বাদী হয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে মামলাটি করেন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে পিচ্চি রাজাকে। তাকে গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।