নজরুল বর্ষে কবি নজরুল ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিল্প বার্তা
বাংলাদেশে উদযাপিত হচ্ছে নজরুল বর্ষ। বুধবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
- আপলোড সময় : ০২-১১-২০২৬ ১১:৪৭:২০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০২-১১-২০২৬ ১১:৪৭:২০ পূর্বাহ্ন
- ৪ মিনিট পড়ার সময়
- ২৬ বার পঠিত
ছবি সংগৃহীত
বাংলাদেশে উদযাপিত হচ্ছে নজরুল বর্ষ। বুধবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে তিনি দিয়েছেন সংস্কৃতি ও নজরুলচর্চা নিয়ে একটি বার্তা। কী ছিল সেই বার্তা?
প্রেম, বিদ্রোহ ও সাম্যের কবি নজরুল
কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের কবি—এ কথা আমাদের সবার জানা। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গায় থেকেও অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিভিন্ন ধর্মের ভাবধারার শিল্পিত প্রকাশ তাঁর জীবন ও সাহিত্যে অনন্যভাবে ফুটে উঠেছে।
নজরুল একদিকে লিখেছেন—
ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ
এলো রে দুনিয়ায়
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস
দেখবি যদি আয়॥
আবার অন্যদিকে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে—
আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে
জপি আমি শ্যামের নাম,
ওগো, মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু
আমার ঠাকুর হলেন রাধাশ্যাম।
নজরুলের এই অসাম্প্রদায়িক ও বহুমাত্রিক সত্তাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক চলে আসছে। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল তাঁকে মূলত মুসলিম জাগরণের কবি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, আরেকটি রাজনৈতিক দল সাম্প্রদায়িকতার আশঙ্কায় তাঁকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছে—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চায় নজরুলকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরেও পড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নজরুলের সাহিত্য ও দর্শন খণ্ডিতভাবে চর্চিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনচিন্তা, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কে বিভাজন ও দ্বন্দ্বের প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নতুন করে নজরুলের উপস্থিতি
নজরুলকে বিতর্কিত করা কিংবা আড়ালে রাখার নানা চেষ্টা থাকলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের মাধ্যমে তাঁকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছে বাংলাদেশ। গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নজরুলের কবিতা ও গানে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজপথে নেমেছেন।
আন্দোলনের সময় বারবার উচ্চারিত হয়েছে তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’ ও ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’-এর মতো সৃষ্টি। তরুণদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে—
কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল কররে লোপাট
রক্ত-জমাট শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে নজরুলের গান ও কবিতা। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর আরেকটি গানের পঙ্ক্তিও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার উৎস—
মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম
মোরা ঝর্ণার মতো চঞ্চল
মোরা বিধাতার মতো নির্ভয়
মোরা প্রকৃতির মতো সচ্ছল।
নজরুল বর্ষের ঘোষণা ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নজরুল বর্ষ উদযাপনের ঘোষণা দেন। এই উদ্যোগকে লেখক দুটি দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন।
প্রথমত, ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই প্রধানমন্ত্রী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্মরণ করেছেন। জুলাইসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নজরুলের কবিতা ও গান যে প্রেরণা জুগিয়েছে, সেই ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতিও এটি গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
দ্বিতীয়ত, নজরুলের প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিষয়টিকে দেখা যায়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আচরণেও সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে তাঁর ভাবনার কিছু দিক প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করেন লেখক। অনুষ্ঠানে নজরুলচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখা শিল্পী ও গবেষকদের আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। তিনি নিজেই সঞ্চালনার দায়িত্ব নিয়ে তাঁদের কথা শোনেন।
তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিল্পী ও গবেষকেরা নজরুলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক, উপেক্ষা কিংবা ফ্যাসিবাদী শাসনামলের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেননি। তাঁদের বক্তব্যে শিশুদের মধ্যে নজরুলচেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। লেখকের মতে, কেবল শিশু নয়—কিশোর, তরুণ, শিক্ষক, শ্রমিক, অভিভাবক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই নজরুলচর্চা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
আমন্ত্রণপত্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আপত্তি: সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতি বার্তা
অনুষ্ঠানের শুরুতে আমন্ত্রণপত্র নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সারা দেশের নজরুলসংগীতশিল্পী, গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি কী বলতে চাচ্ছি তা আপনারা বুঝেছেন।’
লেখকের বিশ্লেষণে, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতিকর্মীদের গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক আয়োজনে যেন দেশের সব অঞ্চলের শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান, সেই প্রত্যাশাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
এর আগে সংসদে ও বিভিন্ন আলোচনায়ও প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার কথা বলেছেন। জাতীয় সংসদে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের পাশাপাশি ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
সংস্কৃতিতে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির সম্ভাবনা
নজরুল বর্ষের উদ্বোধনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিকে বৃহত্তর পরিসরে দেখার একটি আলোচনা সামনে এসেছে। নজরুলের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনকে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজন বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর চর্চায় সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
লেখকের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বার্তার ধারাবাহিকতায় দেশের সর্বস্তরের সংস্কৃতিতে সৃজনশীল অর্থনীতির ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও নতুনভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।