ইসলামের ইতিহাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতী মিশনকে বাধাগ্রস্ত করতে মক্কার কাফেররা নানামুখী চেষ্টা চালিয়েছিল। এসব শত্রুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল, যার চরম শত্রুতা ও কৃপণতার বিবরণ পবিত্র কুরআনের সুরা লাহাব-এ বর্ণিত হয়েছে। সুরাটিতে তাকে 'হাম্মালাতাল হাতাব' বা 'লাকড়ি বহনকারিণী' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেন। একবার কাবা চত্বরে নবীজিকে (সা.) আক্রমণ করতে গিয়েও আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে তিনি ব্যর্থ হন, যা ইসলামের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
সীরাত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, যখন সুরা লাহাব নাজিল হয় এবং উম্মে জামিল জানতে পারেন যে তাকে 'লাকড়ি বহনকারিণী' বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তখন তিনি প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন। একটি ভারী পাথর হাতে নিয়ে তিনি কাবার দিকে ছুটে যান রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আঘাত করার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে তিনি নবীজির (সা.) নামে নানা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছিলেন। সেই সময় কাবা প্রাঙ্গণে রাসুলুল্লাহ (সা.) শান্তভাবে হজরত আবু বকর (রা.)-এর পাশে বসা ছিলেন। কিন্তু উম্মে জামিল সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে; তিনি হজরত আবু বকরকে (রা.) দেখতে পেলেও ঠিক তাঁর পাশেই বসে থাকা নবীজিকে (সা.) মোটেই দেখতে পাচ্ছিলেন না।
উম্মে জামিল রাগান্বিত স্বরে আবু বকর (রা.)-কে প্রশ্ন করেন, তাঁর সঙ্গী কোথায়? তিনি দম্ভভরে ঘোষণা করেন যে, নবীজি (সা.) তাঁকে নিয়ে নিন্দা করেছেন এবং তাঁকে পেলে তিনি পাথর দিয়ে আঘাত করবেন। এমনকি তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র নাম বিকৃত করে 'মুজাম্মাম' বা 'নিন্দিত ব্যক্তি' বলে সম্বোধন করছিলেন। হজরত আবু বকর (রা.) এই পরিস্থিতি দেখে অবাক হয়ে যখন জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি সামনে কাউকে দেখছেন কি না, তখন উম্মে জামিল বিরক্তি প্রকাশ করে জানান যে সেখানে তিনি কাউকেই দেখছেন না। এরপর একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা আবৃত্তি করে তিনি দম্ভভরে সেখান থেকে বিদায় নেন।
উম্মে জামিল চলে যাওয়ার পর হজরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিষয়টি জানতে চান। তখন নবীজি (সা.) মুচকি হেসে ব্যাখ্যা করেন যে, উম্মে জামিল যখন তাঁর সামনে এসেছিল, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতে এক পর্দার সৃষ্টি করেছিলেন। হজরত জিবরাইল (আ.) তাঁর ডানা দিয়ে আড়াল তৈরি করেছিলেন, ফলে উম্মে জামিলের দৃষ্টিশক্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি নবীজিকে (সা.) দেখতে পাননি। এভাবে আল্লাহ কেবল তাঁর শারীরিক সুরক্ষাই দেননি, বরং শত্রুর মুখে নবীজির পবিত্র নাম উচ্চারণেও বাধা সৃষ্টি করেছিলেন যাতে মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত 'মুহাম্মদ' (প্রশংসিত) নামের কোনো অমর্যাদা না হয়।
ডেস্ক রিপোর্ট