রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে সরকারি ভর্তুকির সারের বড় একটি অংশ ডিলারদের হাত ঘুরে কালোবাজারে চলে যাচ্ছে, ফলে আলু ও বোরো মৌসুমের এই সময় কৃষকদের নির্ধারিত দামে সার পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ডিলারের দোকানে সরকারি দামে সার না পেয়ে তারা লাইসেন্সবিহীন ফড়িয়াদের কাছ থেকে প্রতি বস্তায় কয়েক শত টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলাররা প্রতি মাসেই বরাদ্দকৃত সার গুদাম থেকে তুললেও তার বড় অংশ বাফার গুদাম, বন্দর মোকাম বা গোপন গুদাম থেকে সরাসরি চোরাই সিন্ডিকেটের কাছে বেচে দেন; এক জেলার সার আরেক জেলায়, এক উপজেলার সার আরেক উপজেলায় পাচার হয়। কাগজে-কলমে জেলা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটি থাকলেও মাঠে তাদের কার্যকর ভূমিকার প্রমাণ নেই; বরং কিছু নির্বাহী কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সিন্ডিকেটের যোগসাজশের অভিযোগ তুলছেন কৃষকেরা।
তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুরের কেশরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা, নওগাঁ ও নাটোরের বরেন্দ্র এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেচ সুবিধা থাকায় আলু ও বোরো চাষ জোরেশোরে চলছে এবং সেই সুযোগে সার–ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারি নির্ধারিত দাম ডিএপি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও কৃষকদের ১ হাজার ৫০০–১ হাজার ৭০০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকার বদলে ২ হাজার এবং এমওপি ১ হাজার টাকার বদলে ১ হাজার ৩০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে বলে জানান কৃষকরা।
তানোর উপজেলার মাসুদ নামের এক ব্যক্তি শুধু বীজের ডিলার হলেও লাইসেন্স ছাড়াই ট্রাকভর্তি সরকারি সার এনে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ; তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন বিসিআইসি ডিলারের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ২৫০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনে আরও বেশি দামে কৃষকের কাছে বিক্রি করেন। স্থানীয় ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে অভিযোগ অস্বীকার করলেও কৃষকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন—তাদের ভাষ্য, স্টক দেখাতে মনিটরিং টিম এলেও পাচার বন্ধে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, অভিযানে ধরা পড়লেও নামমাত্র জরিমানার মধ্যেই সব মিটে যায়।
কৃষক নেতাদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচনির্ভর উচ্চ ফলনের কারণে সারের চাহিদা বেশি, আর সেই জায়গাটাকেই লক্ষ্য করে শক্তিশালী চোরাই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে; এই সিন্ডিকেটের পেছনে প্রশাসন ও মনিটরিং কমিটির একাংশের মদদ না থাকলে এত বড় পরিসরে পাচার সম্ভব হতো না। তারা রাজশাহীসহ পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলে সমন্বিত অভিযান, ডিলারশিপ বাতিল, জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কৃষক পর্যায়ে সরাসরি সার বিতরণের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
স্টাফ রিপোর্টার