শব্দের ক্যানভাসে জীবনের প্রতিচ্ছবি: চবির সাবেক শিক্ষার্থীর প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ
আটত্রিশটি কবিতার স্নিগ্ধ মেলবন্ধনে প্রকাশিত হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তন্ময় দত্ত মিশুর প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘ইচ্ছে স্বপ্ন প্রকাশনী’ থেকে
- আপলোড সময় : ০২-১১-২০২৬ ০৯:০৩:১৮ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০২-১১-২০২৬ ০৯:০৯:৪৩ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ৪২ বার পঠিত
ছবি: প্রতিনিধি
ঝরা পাতার দীর্ঘশ্বাস থেকে প্রযুক্তির শীতল আলো, কিংবা যাপিত জীবনের কোলাহল ছাপিয়ে অন্তরের গভীরে জমে থাকা নিরবতা—সবকিছুকেই শব্দের জাদুকরি বুননে এক সুতোয় গেঁথেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তন্ময় দত্ত মিশু। এই তরুণ প্রতিভার প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘Every Word Matters’ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘ইচ্ছে স্বপ্ন প্রকাশনী’ থেকে। ২০২৬ সালের আগস্টে আলোর মুখ দেখা এই গ্রন্থটি তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার দ্বিতীয় মাইলফলক। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ‘দাড়িকমা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম বাংলা কাব্যগ্রন্থ ‘পরিশুদ্ধ’।
আটত্রিশটি কবিতার স্নিগ্ধ মেলবন্ধনে সাজানো এই বইটির নেপথ্যে রয়েছেন প্রকাশক আবদুল্লাহ আল তানিম। গ্রন্থটির মুখবন্ধ বা ভূমিকায় স্নেহের পরশ বুলিয়েছেন চবির ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. তাকিত মালিক। শিক্ষকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে বেড়ে ওঠা কোনো শিক্ষার্থীর প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ হাতে পাওয়ার অনুভূতি যে কতখানি বিরল আনন্দের, তা ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়।
মিশুকে একজন কবি সত্তার পাশাপাশি প্রাবন্ধিক, সংগঠক, সম্পাদক ও চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে মূল্যায়ন করে তিনি উল্লেখ করেছেন—বইটির প্রতিটি পঙ্ক্তি পাঠকের মনন ও গভীর মনোযোগ দাবি করে। গ্রন্থটির প্রারম্ভিক এপিগ্রাফে যেন সেই আহ্বানই অনুরণিত হয়— “Sometimes you read a poem, But most times you neglect the words!”
কাব্যগ্রন্থটির পাতা উল্টালেই টের পাওয়া যায় এর বিষয়ের বহুমাত্রিক বিস্তৃতি। সূচনা কবিতা ‘Storm – Before And After’-এ উপকূলীয় প্রকৃতির রুদ্ররূপ, জলোচ্ছ্বাসের ভয়াল থাবা আর স্বজনহারা মানুষের অন্তহীন হাহাকার মূর্ত হয়ে উঠেছে। স্মৃতির রোমন্থনে তৈরি ‘The Change’ কবিতাটি যেন শৈশবের বৃষ্টিভেজা দিনগুলোর সঙ্গে সময়ের পরিক্রমায় মানুষের পাল্টে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আধুনিক যান্ত্রিকতা ও মনের গহিনের দ্বন্দ্বগুলোও বড় সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে বইটির পাতায় পাতায়। ‘Online World’ কবিতায় প্রযুক্তির শেকল কীভাবে আমাদের পারস্পরিক দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে; তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মানুষের গভীরতম আবেগটুকু অনুধাবন করতে পারে কি না—সেই দার্শনিক জিজ্ঞাসাও উস্কে দেওয়া হয়েছে। আবার ‘Poisonous Society’ ও ‘Incurable Disease’-এ কবি তীব্র কৌতূহল ও ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে আঘাত করেছেন সমাজের ছদ্মবেশী ভণ্ডামি, অসহিষ্ণুতা আর কুসংস্কারের ওপর। অন্যদিকে ‘I’m A Man Who Understands Silence’ কবিতায় ধরা দিয়েছে নীরবতার অন্তনির্হিত এক গভীর তাৎপর্য।
দর্শন ও অস্তিত্ববাদের ছোঁয়া পাওয়া যায় ‘Hindu Philosophy’ কবিতায়, যেখানে কর্মফল ও মোক্ষের প্রাচীন ধারণাগুলো নতুন আঙ্গিকে পুনর্পাঠ করা হয়েছে। মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার বার্তা রয়েছে ‘Certainty Is Temporary’ ও ‘What If’ কবিতায়। তবে অন্ধকার বা হতাশার চাদর ভেদ করে ‘Frustration Is A Fact’ ও ‘Believe, Think & Go’ কবিতায় কবি শুনিয়েছেন ঘুরে দাঁড়ানোর সুমহান মন্ত্র। ‘Imagination’ এবং ‘A Very Unique Place’ কবিতার ক্যানভাসে তিনি এঁকেছেন হিংসা, বিদ্বেষ ও ধনী-দরিদ্রের কৃত্রিম বিভাজনহীন এক শান্তিময় পৃথিবীর স্বপ্ন।
পাশাপাশি ‘My Favourite Reader’ কবিতায় অনাগত ভবিষ্যতের পাঠকের সাথে এক নিভৃত সংলাপে মজেছেন কবি। লেখালেখির চিরন্তন আনন্দের প্রকাশ ঘটেছে ‘As A Writer’ ও ‘Poetry’ কবিতায়, আর পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে জীবজগতের অভিযোজনের সংগ্রাম ফুঁটে উঠেছে ‘Nature Is Evolving’ কবিতায়।
১৯৯৯ সালের ২২ এপ্রিল পলিমাটির দেশ কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া তন্ময় দত্ত মিশু চবির ইংরেজি বিভাগ থেকে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। নিছক কলম সাধনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; বরং চবি বন্ধুসভার সাময়িকী ‘জারুলপাতা’-র দ্বিতীয় সংখ্যার সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল লেখার মেলবন্ধনে ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশ করেছেন দেয়ালপত্রিকা ‘এক ফালি রোদ্দুর’। এ ছাড়া তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ব্লাড এইডার্স-চবি’র প্রতিষ্ঠাতা, চবি বন্ধুসভার সাবেক সহসভাপতি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রেখেছেন দীপ্ত স্বাক্ষর।
শব্দের প্রতি গভীর অনুরাগ জাগানিয়া এই কাব্যগ্রন্থটি ২০২৭ সালের অমর একুশে বইমেলা, চবি ক্যাম্পাসসংলগ্ন বইয়ের আড়তগুলো এবং বিভিন্ন অনলাইন বুকশপে পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।