জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন সম্ভাবনা, গুরুত্ব পাচ্ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঋণ-অনুদানের গণ্ডি পেরিয়ে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের দিকে এগোনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
- আপলোড সময় : ৩১-১০-২০২৬ ১১:৩৭:৩৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩১-১০-২০২৬ ১১:৪৫:৩০ পূর্বাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ১৬ বার পঠিত
ছবি সংগৃহীত
জাপানের চার দিনের সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের ৫৪ বছরের উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক এখন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। দুই দেশের পরিবর্তিত চাহিদা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে।
জাপান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। দেশটিতে জনসংখ্যা কমছে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে শ্রমশক্তির সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাপানি কোম্পানিগুলো নতুন বাজার, উৎপাদনকেন্দ্র ও শ্রমিকের সন্ধান করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পপ্রযুক্তি, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য এবং ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান।
দুই দেশের এই চাহিদার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে প্রচলিত সহায়তার পাশাপাশি এখন সহযোগিতার গুণগত মান ও অর্থনৈতিক সুফলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে উভয় দেশ।
ঋণ-অনুদান থেকে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং টয়োটা ও মারুবিনিসহ দেশটির বড় কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। সফরের যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো, জাপানে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয় উঠে এসেছে।
সফরের আগেই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি ও প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এতদিন জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বড় অংশজুড়ে ছিল ঋণ ও অনুদানভিত্তিক সহযোগিতা। এখন জাপানের বেসরকারি খাতের সরাসরি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং যৌথ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ আগামী তিন বছর পর উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের পথে রয়েছে। এতে আগের মতো অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমতে পারে। তাই এর আগেই রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন বাজারের সুযোগ
জাপানের ভোক্তা ও শিল্পবাজারে উচ্চমূল্যের পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং বিশেষায়িত শিল্পপণ্যের চাহিদা রয়েছে। এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পোশাক খাতের বাইরে নতুন রপ্তানি পণ্য তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নতুন পণ্য উৎপাদন, মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিও বাংলাদেশে ব্যবসা ও শিল্পের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশ থেকেও একই ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে।
দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, স্থিতিশীল করব্যবস্থা, দক্ষ বন্দরসেবা এবং কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নিশ্চিত করা জরুরি।
বিগ-বি উদ্যোগে আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঘিরে বড় অবকাঠামো ও আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক লজিস্টিকস এবং শিল্প করিডর উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান ও স্বার্থ বিবেচনায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ
জাপানের শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সেবা খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। জাপানি ভাষা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলে দেশটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
এ জন্য শুধু কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নয়, তাঁদের ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কাজের উপযোগী প্রস্তুতি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ২০২৬ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরে ১২টি অগ্রাধিকার খাতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সমন্বয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ চেয়েছে।
তবে বিদেশি সহায়তার ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সহায়তা ব্যবহারের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন কার্যকর নীতি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি এবং দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সুরক্ষা।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।