চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের ৩ লাখ ১০ হাজার শতক খাসজমির মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার শতকই ভূমি অফিসের রেকর্ড থেকে গায়েব হয়ে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের সঙ্গে ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে এসব জমি বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে। যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে উঠে আসা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী লুট হওয়া জমির বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের রেকর্ডে জঙ্গল সলিমপুরে ৩ লাখ ১০ হাজার শতক খাসজমির উল্লেখ থাকলেও সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার ভূমি কার্যালয়ের রেকর্ডে আছে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮১ শতকের তথ্য। বাকি ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৯১ শতক জমি রেকর্ড থেকে গোপন করে রেজিস্ট্রি ও নামজারির মাধ্যমে ভূমিদস্যুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একজন দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইয়াসিনকে মালিক সাজিয়ে সলিমপুরের বহু জমি বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে এবং দুই অফিসের অনেক কর্মচারীই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
দখলদারদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান 'চৌধুরী অ্যাগ্রো'। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ব্রিকস অ্যান্ড ক্লে ওয়ার্কস, পোর্টলিংক লজিস্টিকস, জলিল টেক্সটাইল মিলস, সীমা অটোমেটিক স্টিল রি-রোলিং মিলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগের আমলে রাজনৈতিক নেতা থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী — সবাই মিলে এই লুটযজ্ঞে অংশ নিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে।
পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও ভয়াবহ। ভূমিদস্যুরা প্রথমে পাহাড়ের গাছ কেটে মাটি ও বালু সরিয়ে প্লট আকারে বিক্রি করেছে। এতে ৭০ শতাংশ পাহাড়-টিলা উজাড় হয়ে এখন দীর্ঘ খালে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ওপর দিয়ে কয়েক কিলোমিটার লম্বা ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে যেকোনো সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণের আশঙ্কা রয়েছে।
২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় খাসজমি উদ্ধারের মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে অর্ধশতাধিক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমি বরাদ্দের আবেদন করেছে, যাদের মোট চাহিদা পরিমাণ পাওয়া জমির অর্ধেকেরও বেশি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমদ জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হবে এবং প্রভাবশালীরা কীভাবে জমি দখল করেছেন তা খতিয়ে দেখা হবে।
ডেস্ক রিপোর্ট