বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আয়কর খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য করের চাপ কমানো, তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি খাতকে উৎসাহ দেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি আনতে একাধিক করছাড় ও নতুন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কর ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা আনার লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি ধাপভিত্তিক কর কাঠামো ঘোষণার চিন্তা করা হচ্ছে। এর ফলে করদাতারা আগাম কর পরিকল্পনা করতে পারবেন এবং কর সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমবে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানো হতে পারে। ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে এ সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। পরবর্তী দুই করবর্ষে তা বেড়ে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হতে পারে।
নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য সাধারণ করমুক্ত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা সুবিধা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বেশি নির্ধারণ করা হতে পারে। তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের ক্ষেত্রেও বিশেষ করসুবিধা বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত করহার অনুযায়ী, করমুক্ত সীমার পরবর্তী আয়ের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের ব্যবস্থা রাখা হতে পারে। এছাড়া ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে অত্যন্ত উচ্চ আয়ের করদাতাদের জন্য অতিরিক্ত করহার চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩ কোটি টাকার বেশি অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ কর আরোপ করা হতে পারে।
তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে ফ্রিল্যান্সিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে অর্জিত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও করছাড়ের সুযোগ বাড়ানো হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আয় করমুক্ত রাখা হতে পারে। নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য আরও বেশি করসুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে স্বস্তি আনতে চাল, গম, ধান, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমিয়ে আনার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় কমতে পারে এবং বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর আরোপিত অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে কর ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। প্রযুক্তিপণ্যের মধ্যে কম্পিউটার মনিটর, প্রিন্টার ও ফ্ল্যাশ মেমোরি আমদানিতে করহার কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে করভিত্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিয়মিত ও সৎ করদাতাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ সম্মাননা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় নির্বাচিত সেরা করদাতাদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সেবা ও সুযোগ-সুবিধায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালের কেবিন সুবিধা, সরকারি অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রণ, পরিবহন টিকিট প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার এবং বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
তবে এসব প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করবে জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর সংসদে অনুমোদন এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।
ডেস্ক রিপোর্ট