প্রায় ১১ মাস তদন্ত শেষে কমিশন গত রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করে। কমিশন প্রধান হলেন মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান।
কমিশনের সূত্রমতে, অভিযুক্ত ৪৯ জন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ঘটনা ঘটানো, সহায়তা, উসকানি, তথ্য গোপন, বা দায়িত্বে অবহেলায় জড়িত ছিলেন।
১. রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংশ্লিষ্টরা (১৭ জন)
১. রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংশ্লিষ্টরা (১৭ জন)
তদন্ত কমিশন মনে করে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ফল এবং এর পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শেখ হাসিনা (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী)
অভিযোগ: 'সবুজসংকেত' প্রদান, বিদ্রোহের শুরুতে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত থাকা, সেনা না পাঠিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের নামে সময়ক্ষেপণ এবং হত্যাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া।
শেখ ফজলে নূর তাপস (তৎকালীন সংসদ সদস্য)
অভিযোগ: বিডিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ও সৈনিকদের অসন্তোষের তথ্য সংগ্রহ, পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণে অংশগ্রহণ, এবং অভিযুক্তদের নিরাপদে পলায়নে সহায়তার দায়িত্ব নেওয়া।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম (আওয়ামী লীগ নেতা)
অভিযোগ: হত্যার ‘সংকেতদাতা’, ঘটনার আগে তাঁর বাসায় বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠক করা।
সাহারা খাতুন (তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)
অভিযোগ: ঘটনার বিভিন্ন ধাপে উসকানি, তথ্য গোপন এবং অস্ত্র সমর্পণের নামে ‘প্রহসনমূলক’ উদ্যোগের নেতৃত্ব দেওয়া।
তানজীম আহমদ সোহেল তাজ (তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী)
অভিযোগ: দায়িত্বে অবহেলা ও সংশ্লিষ্টতা।
জাহাঙ্গীর কবির নানক (আওয়ামী লীগ নেতা)
অভিযোগ: বিদ্রোহের আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাতে অংশ নেওয়া।
মির্জা আজম (আওয়ামী লীগ নেতা)
অভিযোগ: বিদ্রোহের আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাতে অংশ নেওয়া, ঘটনার দিন সাদা কাপড় দেখিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করা (যা বিদ্রোহীদের জন্য সংকেত ছিল)।
অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব:
কামরুল ইসলাম
ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল
মাহবুব আরা গিনি
আসাদুজ্জামান নূর
মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক
শাহীন সিদ্দিক
কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান
মেহের আফরোজ চুমকি
লেদার লিটন
মেজর (অব.) খন্দকার আব্দুল হাফিজ
২. সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা (৩০ জনের বেশি)
তদন্তে সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০ জনের বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ক. সামরিক কর্মকর্তারা (১২ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা):
জেনারেল মইন ইউ আহমেদ (তৎকালীন সেনাপ্রধান)
অভিযোগ: তাঁর সিদ্ধান্ত ও আচরণ হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দেয়। সেনা না পাঠিয়ে অভিযান চালালে ভারতীয় বাহিনী দেশে প্রবেশের যুক্তিতে সময়ক্ষেপণ করা।
ভাইস অ্যাডমিরাল জহির উদ্দীন আহম্মেদ (নৌবাহিনীর প্রধান)
এয়ার মার্শাল এস এম জিয়াউর রহমান (বিমানবাহিনীর প্রধান)
লে. জেনারেল (অব.) সিনা ইবনে জামালী
জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ
অভিযোগ: সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে যাওয়া।
লে. জেনারেল (অব.) মো. মইনুল ইসলাম
লে. জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল হাকিম আজিজ
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামসুল আলম চৌধুরী
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইমামুল হুদা
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহমুদ হোসেন
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব সারোয়ার
খ. গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তারা:
ডিজিএফআই:
লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর
লে. জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ
মেজর জেনারেল (অব.) ইমরুল কায়েস
মেজর জেনারেল (অব.) সুলতানুজ্জামান সালেহ উদ্দীন
এনএসআই:
মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মুনিরুল ইসলাম
মেজর জেনারেল (অব.) টি এম জোবায়ের
র্যাব (৪ জন কর্মকর্তা):
হাসান মাহমুদ খন্দকার (তৎকালীন ডিজি)
মেজর জেনারেল (অব.) রেজানুর রহমান খান
মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আজিম আহমেদ (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স)
অভিযোগ: ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও র্যাবকে নিষ্ক্রিয় রাখা।
গ. বিডিআরের কর্মকর্তা (৩ জন):
কর্নেল (অব.) সাইদুল কবির
লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ
মেজর (অব.) গোলাম মাহবুবুল আলম চৌধুরী
ঘ. পুলিশের কর্মকর্তারা:
নূর মোহাম্মদ (সাবেক আইজিপি)
অভিযোগ: শুধু নিজের মেয়ে ও কিছু পরিবারের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করায় দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেওয়া।
নাঈম আহমেদ (তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার)
বাহারুল আলম (সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) ও বর্তমান আইজিপি)
মনিরুল ইসলাম (সাবেক অতিরিক্ত আইজি)
আব্দুল কাহার আকন্দ ও তাঁর তদন্ত দল (সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি)
অভিযোগ: দায়িত্বে অবহেলা, সত্য গোপন করা এবং অপরাধীদের পালানোর সুযোগ দেওয়া।
৩. সংবাদমাধ্যম কর্মী (৩ জন)
পিলখানা হত্যাকাণ্ড চলাকালে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনে সরাসরি নাম উল্লেখ করা না হলেও, তিন জন সংবাদমাধ্যম কর্মীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ: উত্তেজনাকর এবং একতরফা খবর প্রচার, পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলা, বিদ্রোহীদের দেওয়া চিরকুটের বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই না করেই তাৎক্ষণিকভাবে প্রচার করে 'অবিবেচনাপ্রসূত আচরণ' করা।
৪. বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ কর্মকর্তা:
অভিযোগ: তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এই ২৪ কর্মকর্তা ওই ঘটনায় সরাসরি ভূমিকা রাখেন। সোহেল তাজ ও শেখ সেলিমের উপস্থিতিতে বৈঠকে অংশ নিয়ে কর্মকর্তা হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন।
হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতা:
হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতা:
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে:
সরাসরি ভূমিকা: কমিশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদস্যের মতে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন কর্মকর্তা ওই ঘটনায় সরাসরি ভূমিকা রাখেন।
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের জন্য তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসের বাসায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সোহেল তাজ ও শেখ সেলিমের উপস্থিতিতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার এই ২৪ জনের দল অংশ নেয় এবং সেনা কর্মকর্তা হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাক্ষীর সাক্ষ্য: বিদ্রোহ শুরুর পর ক্যাপ্টেন তানভীর হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা পিলখানায় বিডিআরের পোশাক পরা তিনজনকে হিন্দিতে গালাগাল করতে শোনেন। একাধিক সাক্ষী ঘটনার দিন পিলখানায় হিন্দি, পশ্চিমবঙ্গীয় টানে বাংলা এবং অচেনা ভাষায় কথোপকথন শোনার কথা জানিয়েছেন।
বহিরাগত প্রবেশ: ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারী বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, যাঁদের মধ্যে ৬৫ জনের বহির্গমনের তথ্য নেই। ওই সময়ে ১,২২১ জনের বহির্গমনের তথ্য থাকলেও ৫৭ জনের আগমনের কোনো রেকর্ড ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
ডেস্ক রিপোর্ট