মানবসম্পদের অপচয় বাড়ছে, কর্মসংস্থানে পিছিয়ে বাংলাদেশ।
উচ্চশিক্ষার বিস্তার সত্ত্বেও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না তরুণেরা; অনানুষ্ঠানিক খাতে ৮৪ শতাংশ কর্মী, বাড়ছে মানবসম্পদের অপচয়
- আপলোড সময় : ০৮-১১-২০২৬ ০২:২৫:০৫ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-১১-২০২৬ ০২:২৫:০৫ অপরাহ্ন
- ৫ মিনিট পড়ার সময়
- ৩৫ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও সেই অনুপাতে তৈরি হচ্ছে না মানসম্মত কর্মসংস্থান। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। কেউ বেকার থাকছেন, আবার কেউ শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কম আয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষিত মানুষের ৬০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। একই সঙ্গে দেশের মোট কর্মীর প্রায় ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এসব তথ্য দেশের শিক্ষা, শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যকে সামনে এনেছে।
বিশ্বব্যাংকের Demographic Change in South Asia: From Tailwinds to Headwinds for Development শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত মানুষের একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা মানেই বেকারত্ব নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়া এবং অর্জিত দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার করতে না পারার ইঙ্গিত দেয়।
একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা অর্জনে ব্যয় করেন। এর পেছনে পরিবার ও রাষ্ট্র উভয়েরই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ থাকে। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে যদি তাঁকে নিজের যোগ্যতার তুলনায় নিম্নমানের বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যুক্ত হতে হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। ব্যক্তির কর্মজীবনের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও মানবসম্পদের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার দূরত্ব, ব্যবহারিক দক্ষতার অভাব এবং উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি না হওয়া এ সমস্যার অন্যতম কারণ।
দেশের শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিক্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গৃহকর্ম ও বিভিন্ন সেবামূলক পেশায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করছেন। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন ও চাকরির নিরাপত্তা থাকে না। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। ফলে কর্মসংস্থান থাকলেও অনেকের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল জীবন নিশ্চিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম বড় সম্ভাবনা। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলে উৎপাদন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়, যা জনসংখ্যাগত সুবিধা হিসেবে পরিচিত। তবে এই সুবিধা কাজে লাগাতে হলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এরপর বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। ২০৫১ সালের মধ্যে মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি হতে পারে। পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চাহিদার তুলনায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুযায়ী কাজ তৈরি না হলে জনসংখ্যাগত সুবিধা অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হতে পারে।
আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতিও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার বছরে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হারের অর্ধেক। বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, জ্বালানি সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং শিল্প খাতের সীমিত বহুমুখীকরণ এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত হারে সম্প্রসারিত না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত থাকছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতিও শ্রমবাজারের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন পর্যালোচনায় ২০২৬ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের সমস্যাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু তরুণদের দক্ষতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; তাঁদের নিয়োগের সক্ষমতা রয়েছে এমন শিল্প ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও জরুরি।
কর্মসংস্থানের সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নারীর সীমিত শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব, শিশুযত্নের সীমিত সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং পারিবারিক দায়িত্বের কারণে অনেক নারী কর্মজীবনে যুক্ত হতে পারেন না। নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে পারিবারিক আয় ও জাতীয় উৎপাদনশীলতা উভয়ই বাড়তে পারে। এ জন্য নিরাপদ যাতায়াত, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, কর্মক্ষেত্রে শিশুযত্নের ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। অন্যদিকে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের ভর্তির হার ৩৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৬২ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দক্ষ ও সুস্থ জনশক্তি তৈরির প্রাথমিক সুযোগও সবার জন্য সমান নয়।
সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতিও শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পেনশন, অবসরকালীন ভাতা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। কর্মক্ষম বয়সে নিয়মিত কাজ করলেও অবসরের পর তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়লে এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নীতির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ জরুরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে।
একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ন্যায্য মজুরি, নিয়োগপত্র, স্বাস্থ্যবিমা ও পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ জনশক্তির পরিবর্তে প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—দেশের বিপুল জনশক্তিকে কতটা উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা যাচ্ছে? একদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে অধিকাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ধীরগতি, নারীর সীমিত অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশের সামনে জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, মানসম্মত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক নিরাপত্তাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্ভর করে তার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ, আয় ও উৎপাদনশীলতার ওপর।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।