(মাসিক আল কাউসার ওয়েবসাইট থেকে)
এক.
ইসলাম মানবজাতির জন্য উত্তম জীবনব্যবস্থা দান করেছে। মুসলিমদের জন্য তো কথাই নেই; বিশ্ব মানবের জন্য এর চেয়ে সুন্দর জীবনব্যবস্থা নেই।
দুনিয়ার সকল মানুষই সুখ ও শান্তি চায়। বিধর্মী বা অমুসলিমদের বড় অংশ ধর্মকর্ম বা ইবাদত-বন্দেগীর তেমন ধার ধারে না। ওরা নাস্তিক্যবাদের শিকার অথবা আল্লাহতে বিশ্বাস রেখেও পরকালে বিশ্বাস রাখে না; কিন্তু মুসলিম ও অমুসলিম সবাই দুনিয়ার জীবনে অর্থাৎ নগদ বা উপস্থিত জীবনে সুখ-শান্তি কামনা করে এবং তা ভোগ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে।
বলা বাহুল্য, ইসলাম যে রুটিনব্যবস্থা মুসলিম সম্প্রদায়কে দান করেছে, তা অন্য কোনো ধর্ম দিতে পারেনি। ইসলাম খাওয়া-পরার যে রীতি-নীতি দান করেছে, কর্ম ও বিশ্রামের সময় ও পরিমিত নিয়ম-নীতির যে শিক্ষা দিয়েছে, তা অন্য কোনো ধর্মে নেই। ফলে অমুসলিমরা এই জীবনেই যে সুখ-শান্তি কামনা করে, তা ইসলামী রুটিন অনুযায়ী জীবনযাপনকারী একজন মুসলিমের মতো কিছুতেই পায় না।
দুই.
মুসলমানদের জীবনব্যবস্থা মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত ও নির্ধারিত, মানুষ কর্তৃক নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনায় কোনো ভুল নেই। অন্যদিকে মানুষের চিন্তায় অসংখ্য ভুল রয়েছে— যদি না তা আল্লাহ-রাসূলের নির্দেশনার অনুগত হয়। (সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
আবু বারযা রা. থেকে বর্ণিত—
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ العِشَاءِ وَالحَدِيثَ بَعْدَهَا.
অর্থাৎ নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার নামাযের আগে ঘুম অপছন্দ করতেন এবং ইশার নামাযের পর গল্পসল্প অপছন্দ করতেন। —সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৮
ইশার নামাযের পর রাত জাগলে একে তো তাহাজ্জুদের মতো ফযীলতবিশিষ্ট সর্বোত্তম নফল নামায কাযা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা; এর চেয়ে বড় ক্ষতি, ফজরের নামায কাযা হওয়া।
তৃতীয়ত, এতে পার্থিব বিবেচনায় স্বাস্থ্যগত অনেক ক্ষতি রয়েছে।
আমারই নামাযী মুসল্লী ভাইদের কেউ কেউ পরিষ্কার স্বীকার করে বলেছেন, গিয়াস ভাই! আল্লাহর রহমতে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের চার ওয়াক্তই তো মসজিদে এসে জামাতে পড়ি, তবে ফজর নামাযটা মসজিদে এসে জামাতে পড়তে পারি না।
তখন আমি বলি, ইশার নামাযের পর মোবাইল, টেলিভিশন ইত্যাদি দেখে, খাওয়া-দাওয়ায় দেরি করে, দেরিতে ঘুমিয়ে তার খেসারত হিসেবে এক ওয়াক্ত ফরয নামায কাযা করে বা তার জামাত থেকে বঞ্চিত হয়ে দোযখের শাস্তি মাথায় নেন!
এখনই সাবধান হয়ে যান, নতুবা পরিণতি খুবই খারাপ হবে। আল্লাহ তাআলা রক্ষা করুন— আমীন!
তিন.
ইশার নামাযের পর নামাযী বেনামাযী সকলকেই দেখা যায়— রাতকে রাতই মনে করছেন না। ছোট-বড়, ছেলে-মেয়ে, প্রায় সবাই ঘুমাতে যাওয়া তো দূরের কথা— রাতের খাওয়া-দাওয়ারও নাম নেয় না। লেখাপড়ার নামমাত্র কিছু ছাত্র-ছাত্রী বাদে ঘরের ছোট-বড় সবাই অযথা গল্পগুজবে মেতে আছে। অন্য আত্মীয় দাওয়াতে আসা অথবা এ বাড়ি থেকে অন্যত্র দাওয়াতে যাওয়া, তা-ও এই রাতের বেলায়। প্রায় সবারই মনোভাব এই যে, দিনের বেলায় সাংসারিক কত কাজকর্ম, অফিসে যাওয়া, হাটবাজার করা ইত্যাদি হরেকরকম ব্যস্ততা থাকে। কাজেই বেড়ানো, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান করা, অন্য ছোটখাটো দাওয়াতে যাওয়া রাতের বেলায় ছাড়া উপায় কী!
চার.
অনেক পরিবারে দেখা যায়, ইশার পর অযথা গল্পগুজব করতে করতে প্রায় এগারোটা থেকে বারোটা বাজায়। তারপর খাওয়া-দাওয়ার প্রস্তুতি এবং তা থেকে অবসর হতে একটা থেকে দুইটা বাজে। এতে করে আমরা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্কবাণী— ইশার আগে ঘুমাতে নেই এবং ইশার পর শয়নে দেরি করতে নেই— হেলায়-খেলায় ছেড়ে দিয়ে কত বড় নাফরমানী করলাম!
রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উল্লিখিত বাণীর অনুসরণ না করায় আমরা মুসলমানরা যে দ্বীনী কত মহা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি, তা এতক্ষণে বুঝতে পারলাম—
প্রথমটা তো বললাম, আল্লাহ তাআলার ফরয বিধান ও তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত ফজর নামায নাগা বা কাযা হওয়া। এর ওয়ায়ীদ বা শাস্তি কুরআন-হাদীসে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তাহাজ্জুদ কাযা হওয়া।
তৃতীয়ত, ইশরাক কাযা হওয়া।
এর বাইরে স্বাস্থ্যগত বিবিধ ক্ষতির বিষয় তো আছেই।
পার্থিব যে ক্ষতিটি, যা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য, তা হচ্ছে স্বাস্থ্যগত ক্ষতি। মানবজাতির স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার বিধানে রাত হচ্ছে ঘুমানোর জন্য, দিনের কাজকর্ম ও লেখাপড়ার শ্রান্তি-ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করার জন্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَّجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا، وَّجَعَلْنَا الَّیْلَ لِبَاسًا، وَّجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا .
এবং তোমাদের নিদ্রাকে বানিয়েছি ক্লান্তি দূর করার উপায়। আর রাতকে করেছি আবরণ এবং দিনকে বানিয়েছি জীবিকা উপার্জনের সময়। —সূরা নাবা (৭৮) : ৯-১১
দেহ বা শরীর থেকে এই শ্রান্তি ও ক্লান্তিজনিত অবসাদ দূর না হলে স্বাস্থ্যের ঘাটতি হতে থাকবে। স্বাস্থ্য ঘাটতির ফলাফল কী, তা অতি স্পষ্ট।
পাঁচ.
রাত জাগার এই কঠিন রোগটা অতি পুরোনো নয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অধম লেখকের জন্ম। আমরা সেই যুগে, এমনকি আরও অনেক পরেও জাতির এই দুর্দশা দেখিনি।
মনে হয়, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বা এর কিছু পূর্বে এ দুর্দশার অবতরণ। অনেক আগে থেকেই টেলিভিশন ছিল বটে; কিন্তু বাটন সেট ও স্মার্টফোনের জন্ম ধাপে ধাপে এই একবিংশ শতাব্দীতে। প্রথমে মোবাইল বের হলে তা যে লোক কিনল, তার কী আনন্দ! রাস্তায় বেরিয়ে এসে নাচানাচি করে আর অন্য যে ব্যক্তি তার মতো মোবাইল কিনেছে, তার সাথে সশব্দে কথা বলে এবং খুবই তৃপ্তিবোধ করে।
পরে যখন প্রায় ঘরে ঘরে জিনিসটির আমদানি হলো এবং বেশ রাত জেগে কম বয়সি, আধা বয়সি, এমনকি বুড়োবুড়ি পর্যন্ত এ নিয়ে মেতে উঠল, তখন আর ঘরের কিশোর ছেলেমেয়েরা যায় কোথায়! দিনদুপুরের কাজকর্ম সেরে ঘরের প্রায় সবাই আনন্দে মেতে ওঠে, তখন আর সময় মতো কীসের খাওয়া, কীসের ঘুম!
অনেক কিশোর ছেলেদের কথা শুনেছি, অনেক রাতে কোনোরকমে চারটা খেয়ে সারারাত জেগে তার নিজেরই সংগৃহীত টাচ মোবাইল নিয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। ভোরে ঘুমে ঢলে পড়লে হাত থেকে মোবাইল খসে পড়ে। আর মরার মতো অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে। কোথায় তার স্কুল, কলেজ ও শিক্ষা-দীক্ষা। কারও কথা সে পরোয়া করে না; ধ্বংসে নিমজ্জিত হয়।
ছয়.
মোদ্দা কথা, বর্তমান কাল পর্যন্ত রাত জাগার উপকরণ অনেক বেরিয়েছে। ফলে দেশের প্রায় প্রতিটি ঘরের পরিবেশ রাতজাগা হয়ে গেছে। হাট-বাজার-দোকানপাটের অবস্থা লক্ষ করুন, বুঝবেন! যাদের লেখাপড়া বা ব্যবসা-বাণিজ্য নেই, তারাও ইশার পর বেশ রাত পর্যন্ত বন্ধু-বান্ধবের সাথে গল্পসল্প করে বাইরে কাটিয়ে ঘরে আসে। তারপর ঘরের লোকদের সঙ্গে কিছু কথাবার্তা না বললে কি আর হয়! এমন করে রাত বারোটা বাজতে অসুবিধা কোথায়! ধার্মিক-অধার্মিক নির্বিশেষে প্রায় সকল পরিবারেই একই অবস্থা চলছে অথবা চলতে শুরু করেছে।
মোটকথা, রাত জাগাটা প্রায় সকল ফ্যামিলির ট্র্যাডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে ক্রমান্বয়ে জাতিগতভাবেই যদি আমরা মুসলমানরা এই ট্র্যাডিশন -এর অধীন হয়ে পড়ি, তাহলে আমাদের সবার না হোক, স্বল্পসংখ্যকের হলেও হযরত সদর ছাহেব রাহ.-এর মতো বুকফাটা কান্না হবে।
সাত.
আহ! হযরত সদর ছাহেব হুজুর! জাতির জন্য তাঁর কী মায়া! অপ্রাসঙ্গিক নয়, প্রাসঙ্গিকভাবেই হযরতের উল্লেখ করছি।
হযরতের ইন্তেকাল ১৯৬৯ ঈসাব্দে। তাঁর জীবদ্দশায় যখন আমাদের দেশে ক্রিকেট খেলা শুরু হয়, তখন হযরতের বুকফাটা কী আর্তনাদ ও আহাজারি! খেলাটা জাতীয়ভাবে আরম্ভ হওয়ার ঘোষণা শুনে হযরত বারবার বুক চাপড়াচ্ছিলেন আর আর্তনাদ করে করে বলছিলেন, হায়! কী পরিণাম হবে এ জাতির!
হযরত রাহ.-এর দূরদর্শিতা ও নূরে কারামত বাস্তবেই উল্লেখ করার মতো। প্রতিযোগিতামূলক যে খেলাধুলাকে ইসলাম অনুমোদন করেনি, তার ভবিষ্যৎ অশুভ পরিণাম সম্পর্কে হযরত রাহ. অর্ধশতাব্দী পূর্বেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। আন্তর্জাতিক খেলার সেই অশুভ পরিণাম আজ শুধু অমুসলিম জাতিকে নয়; বরং মুসলিম জাতিকেও উন্মাদ করে তুলেছে। বিশ্বের আর্থিক অপচয় ছাড়াও বিশ্ব মানবের সীমাহীন যে বেহায়াপনা উন্মাদনার সয়লাব এসেছে, তার শেষ কোথায়? বিশ্ব মুসলিম ডুবে গেছে গুনাহে কবীরায়। এ কি কিয়ামতের আলামত নয়?
মুহাররম মাসের (জুলাই ২০২৬) মাসিক আলকাউসারের পাতা খুলুন এবং জনাব সম্পাদক সাহেবের ‘বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা : কোথায় যাচ্ছি আমরা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি আবার মনোযোগের সঙ্গে পড়ুন এবং চিন্তা করুন আমাদের যাত্রাপথের কথা, যে যাত্রাপথ আমাদের নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসলীলার দিকে।
অমুসলিমদের তো কথাই নেই। মুসলিম জাতিও তো ধর্ম-কর্ম, দ্বীনী সংস্কৃতি থেকে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। মুসলিম আরব বিশ্ব বর্তমানে এই খেলাধুলায় অমুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গৌরব বোধ করছে। বিশ্ব মুসলিমের প্রাণকেন্দ্র হারামাইন শরীফাইনের তত্ত্বাবধায়ক সৌদি সরকার সে দেশের মেয়েদের বিশ্ব প্রতিযোগিতার খেলায় নামিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশসহ সমগ্র মুসলিম জাহানের বয়স্কা মেয়েরা হাফ প্যান্ট ও গেঞ্জি পরে খেলায় নেমেছে। সৌদি আরবেও বিস্তর সিনেমা হল নির্মাণের ব্যবস্থা হয়েছে। মুসলিম জাতি পূর্বে যে সভ্যতা-সংস্কৃতি লালন করছিল, আজ তারা তা ছুঁড়ে ফেলে দিল। এ কিয়ামতের আলামত নয় তো আর কী!
আট.
বিশ্বজুড়ে যখন খেলার ধুম চলতে থাকে, তখন মুসলিম কিশোর বয়সি ছেলে-মেয়ে এবং যুবক-যুবতীদের তো কথাই নেই, ধর্মকর্মে অভ্যস্ত বয়স্ক লোকেরা পর্যন্ত রাতভর খেলা দেখে ভোর রাতে ঘুমে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে থাকে। তখন কোথায় তাদের ফজর নামায, কোথায় তাদের ফজরের জামাত! ফজরে মসজিদগুলো বিরান দেখা যায়। জামাতে মুসল্লির সংখ্যা নগণ্য। মুসলিম জাতির যে ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা হযরত সদর ছাহেব রাহ. করেছিলেন, তা-ই বাস্তবে রূপ নিল। এখন ধ্বংসে নিমজ্জিত এই জাতিকে একমাত্র আল্লাহ তাআলা যদি রক্ষা করেন!
নয়.
লোকেরা টেলিভিশন, স্মার্টফোন- এসব দেখে রাত জাগার কারণে ফজরের জামাত, এমনকি স্বয়ং ফজরের নামায কাযা করছে। হযরত রাহি. যদি বেঁচে থাকতেন, এসব দেখে সম্ভবত বুকফাটা আর্তনাদ করে আধমরা অবস্থায় শয্যাশায়ী হয়ে কাতরাতেন। যেভাবে ফুটবলে সাবালক মেয়েরা নেমেছে গেঞ্জি গায়ে এবং হাফপ্যান্ট পরে, তাতে নারী জাতির সতীত্ব, সম্ভ্রম আর ইসলামের পর্দা ব্যবস্থা রইল কোথায়! এরা পুরুষ দর্শকদের সামনে প্রায় উলঙ্গ হয়ে গেছে। এই হায়াওয়ানিয়াতের স্থান কোথায়?
কবি বলেন—
মানুষ হয়ে হায়াওয়ানিয়াত (পশুত্ব) করেছ বরণ!
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করে ইরশাদ করেছেন—
وَإِذَا أَرَدْتَ فِتْنَةً فِيْ قَوْمٍ فَتَوَفَّنِيْ غَيْرَ مَفْتُوْنٍ.
[যখন কোনো সম্প্রদায়ের ওপর বালা-মসিবত নাযিল করো, তখন বালার ভেতরে পড়ে যাওয়ার পূর্বেই আমাকে তুমি উঠিয়ে নিয়ো। (দ্র. জামে তিরমিযী, হাদীস ৩২৩৫]
এই অধমকে হযরত শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক রাহ. ‘মুনাজাতে মকবুল’ পড়ানোর সময় বলেছিলেন, হযরত সদর ছাহেব রাহ. ‘মোনাজাতে মকবুল’-এর তরজমা করেছেন, আর তাঁর সৌভাগ্য যে, আমাদের দেশে এই সমূহ মসিবত নাযিলের পূর্বে আল্লাহ তাআলা তাঁকে উঠিয়ে নিয়েছেন। রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।
দশ.
এখন আমরা যারা এ ধরনের মারাত্মক পাপাচার ও গুনাহে পড়েছি, তাদের উপায় বা গতি কী?
একে তো এসব খেলাধুলা (যথা ক্রিকেট ও ফুটবল এবং স্মার্টফোনে সতর খোলা খেলাধুলা ও নাচ-গানের দৃশ্য) দেখা, যা সম্পূর্ণ হারাম।
দ্বিতীয়ত (দিনে তো আছেই, তদুপরি) রাত জেগে খেলাধুলা দেখা এবং অযথাই গল্পগুজব করে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত জাগ্রত থেকে ফজরের নামায কাযা করা ইত্যাদি।
ছেলে-মেয়েদের ক্রিকেট ও ফুটবল খেলা যারা দেখল, তারা দুই থেকে তিনটা কবীরা গুনাহ করল—
এক.খেলা দেখার গুনাহ,
দুই.মেয়েদের দেখার গুনাহ,
তিন. বেপর্দা খেলোয়াড়দের দেখার গুনাহ। অর্থাৎ খেলার ভেতর পুরুষদের হাঁটু ও তার উপরিভাগ এবং মেয়েদের আপত্তিকর দৃশ্য দেখা
আর স্মার্টফোনে নাচ-গান ও সতর দেখার গুনাহ।
শুধু রাত জাগা কবীরা গুনাহ নয় বটে, কিন্তু এর ফলে যদি ফরয নামায কাযা হয়, তবে তাও কবীরা গুনাহের কারণ হলো।/p>
যাহোক, নামায কাযা করা, ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলা দেখা, মোবাইলের উল্লিখিত ব্যবহারসমূহ— এসবই গুনাহ ও আল্লাহর নাফরমানী। যার পরিণাম ও শাস্তি খুবই কঠিন। এ থেকে বাঁচার একটাই পথ। তা হচ্ছে, সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং সকল ফরয যথাযথভাবে আদায় করা। আর এর জন্য রাত জাগার বদঅভ্যাস বাদ দেওয়া ও মোবাইলের অবৈধ ব্যবহার পরিহার করা জরুরি। /p>
থানভী রাহ. ও হাফেজ্জী হুজুরের আমল আমাদের সিলসিলায়ে আশরাফিয়ার প্রধান মুরব্বী হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. প্রবন্ধের শুরুর দিকে বর্ণিত হাদীসের ওপর যেভাবে আমল করে উম্মতকে দেখিয়েছেন, তার উদাহরণ আমাদের জন্য খুবই অনুসরণীয়। তিনি মাগরিবের আগেই রাতের খাবার খেতেন। মাগরিবের পর থেকে ইশা পর্যন্ত আওয়াবীন, যিকির-আযকার ও ওযীফার আমল করতেন। /p>
ইশার পর কথাবার্তায় মনোযোগ না দিয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে যেতেন। রাত ১টার দিকে তাহাজ্জুদের জন্য আপনিই চোখ খুলে যেত। তাহাজ্জুদ শেষে যিকির করে আবার ফজরের আগে একটু ঘুমাতেন। ফজরের আযানের পর নামায পড়তেন। নামায শেষে কয়েক মাইল হাঁটতেন এবং ফিরে আসা পর্যন্ত এক মনযিল (সাড়ে চার পারা) কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এরপর রুটিনমাফিক কাজে লেগে যেতেন। /p>
আমাদের হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ. তাঁর শায়েখের অনুসরণে মাগরিবের আগে ভাত খেতেন। মাগরিব বাদ নিয়মমাফিক আওয়াবীন, ওযীফা, যিকির-আযকার, ইসলাহী কাজকর্ম করতেন। সেইসঙ্গে কিছু পানাহার করতেন। ইশার পর ঘুমের আয়োজন হতো। মধ্যরাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। যিকির-আযকারের পর আবার ঘুমিয়ে উঠে ফজর নামায পড়তেন। তারপর রুটিন অনুযায়ী কাজে লেগে যেতেন। /p>
আমাদের নিকটবর্তী এই আল্লাহওয়ালাদের জীবনের যে রুটিন, তা-ই সত্যিকার ইসলামী রুটিন। সারাদিন ও রাতের রুটিনে প্রবন্ধে উল্লিখিত গুনাহ করার অবকাশ নেই। কীসের খেলাধুলা, কীসের রাত্রীজাগরণ!
উল্লিখিত হাদীস অনুসারে ইশার আগে ঘুমাতে হয় না, ইশার পর গল্পগুজব, আড্ডাবাজিও করতে হয় না। ইশার পরই খাওয়া-দাওয়া, তারপর শুয়ে যাওয়া, আরামে ঘুমানো, মধ্য বা শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়া ও যিকির-আযকার করা।
তারপর আরও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ফজর পড়ে রুটিনমাফিক সারা দিনের কাজকর্ম করা।
/p>
সম্ভব হলে দুপুরে খাওয়ার পর কিছু কায়লুলা করা, এতে ক্লান্তি লাঘব হয়। /p>
ফজর থেকে এশা পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাতে পড়া। দিনে সুযোগ ও সাধ্যমতো ‘আমর বিল মা‘রুফ ও নাহি আনিল মুনকার’ তথা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে যাওয়া। /p>
আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট মানবজাতির জন্য আল্লাহরই মনোনীত ইসলামী নেজাম মতো যদি জীবনযাপন করা যায়, তাহলেই তো আল্লাহওয়ালা হওয়া যায়। /p>
আল্লাহ তাওফীক দান করুন।