অগ্নিসংগ্রাম ও একজন মায়ের গল্প:
গাজা সিটির একটি তাবু ভেতরে জীর্ণ এক ছোট লাইটার হাতে বসে আছেন ৪৬ বছর বয়সী রবাব দাইফাল্লাহ। পাঁচ সন্তানের এই জননী কাঠে আগুন ধরাতে বারবার লাইটারটি জ্বালানোর চেষ্টা করছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নতুন লাইটার কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় তাঁর ছেলে পুরানো এই লাইটারটি বেশ কয়েকবার মেরামত করে সচল রেখেছে।
রবাবের পুরো দিনটি কাটে আগুন জ্বালানোর সংগ্রাম ঘিরে। কারণ রুটি সেঁকা, পানীয় জল ফোটানো, সন্তানদের জন্য রান্না করা ও চা বানানো—সবকিছুর জন্যই কাঠ পোড়াতে হয়।
“আমাদের পুরো দৈনন্দিন জীবন এখন আগুনের ওপর নির্ভরশীল,” আল জাজিরাকে বলেন রবাব। “আর সেই আগুন জ্বালানোর প্রথম ধাপটি শুরু হয় একটি লাইটার দিয়ে। অথচ গাজায় এখন এটিই সবচেয়ে দুর্লভ বস্তু।”
যুদ্ধের আগে একটি শেকেলে (প্রায় ০.৩৩ ডলার) তিনটি লাইটার পাওয়া যেত। আর আজ গাজার বাজারে একটি নতুন লাইটারের দাম দাঁড়িয়েছে ২৭ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত! সম্প্রতি নিজের পুরানো লাইটারটি মেরামত করতেই রবাবকে গুণতে হয়েছে ১২ ডলার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমি কি এই টাকায় একটি লাইটার ঠিক করব, নাকি এক বস্তা আটা কিনব?”
আগুনের স্ফুলিঙ্ক ধার করার দিনকাল:
সীমিত সম্বল থাকায় গাজাবাসী খাদ্যসামগ্রী কিনতেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে একাধিক তাবুর পরিবারগুলোর মাঝে মাত্র একটি লাইটার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
কোনো দিন লাইটার না পেলে রবাবের পরিবারকে ঠাণ্ডা খাবার খেয়েই রাত কাটাতে হয়, অথবা প্রতিবেশীর চুলায় আগুন জ্বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কখনো তিনি প্রতিবেশীর জ্বলন্ত চুলা থেকে এক টুকরো শক্ত কাগজ জ্বালিয়ে এনে নিজ ঘরে আগুন ধরান। আবার প্রতিবেশীরা রুটি বানানোর সময় তাদের চুলায় নিজের পরিবারের খাবারটুকুর সংস্থান করে নেন।
মাটির চুলা ও বাড়তি দুর্ভোগ:
একই পরিস্থিতির মুখোমুখি জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৪৩ বছর বয়সী হাসনা মনসুর। ছয় সন্তানের জননী হাসনা পরিবার চালাতে মাটির চুলায় রুটি ও খাবার বানিয়ে বিক্রি করেন।
তিনি জানান, রান্না করার গ্যাস থাকলে সামান্য স্ফুলিঙ্গেই আগুন জ্বলে ওঠে। কিন্তু মাটির চুলায় কাঠ বা কাগজ দিয়ে আগুন ধরাতে ভালো আগুনের দরকার হয়। তিনি বলেন, “সকাল থেকে বসে আছি, সকাল ১০টা বেজে গেলেও চুলা জ্বালাতে পারিনি। মেঝ মেয়েকে কাগজের টুকরো দিয়ে পাঠালাম কারোর জ্বলন্ত চুলা থেকে আগুন আনতে, কিন্তু ও কাউকে পায়নি।”
অবরোধ ও দ্বিমুখী সংকট:
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (OCHA) এবং গাজা চেম্বার অব কমার্স জানিয়েছে, ইসরায়েলের অব্যাহত ক্রসিং অবরোধ ও পণ্য চলাচলে কড়াকড়ির কারণে জরুরি পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। অনেক সাধারণ সামগ্রীকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ “দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য” (সামরিক কাজে ব্যবহারের সুবিধাযুক্ত) হিসেবে চিহ্নিত করায় সেগুলো গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। লাইটারও সেই নিষিদ্ধ বা আটকে দেওয়া পণ্যের তালিকায় রয়েছে।
নতুন পেশা, লাইটার মেরামত:
এই সংকটের কারণে গাজায় উদ্ভব হয়েছে এক নতুন পেশার। আগে চালক হিসেবে কাজ করা ২৪ বছর বয়সী তামের আল-শাউইশ এখন আল-কারমেল স্কুল ক্যাম্পের পাশে ছোট একটি স্টলে লাইটার মেরামতের কাজ করছেন।
তামের বলেন, “যুদ্ধের আগে কেউ লাইটার মেরামতের কথা ভাবতেও পারত না। কারণ এগুলো সস্তা ছিল এবং গ্যাস ফুরিয়ে গেলে ফেলে দিয়ে নতুন কেনা হতো। কিন্তু এখন মানুষ নতুন কিনতে না পেরে মেরামতের জন্য ছোটায়।” নষ্ট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন লাইটার থেকে পার্টস খুলে এনে অন্য লাইটার সচল রাখছেন তিনি।
গাজা সিটির আল-কারমেল স্কুলে আশ্রয় নেওয়া শাদি আবু শামলা নামের এক বাস্তুচ্যুত পিতা জানান, পুরো আশ্রয়শিবিরে হয়তো মাত্র ৩-৪টি লাইটার সচল আছে। এক তাবু থেকে অন্য তাবুতে হাতবদল হয়ে ঘোরে এই লাইটারগুলো।
তিনি আফসোস করে বলেন, “আজকের গাজায় লাইটারই হলো জীবনের মেরুদণ্ড। তাবুতে লাইটার থাকা মানে আপনি টিকে আছেন, না থাকলে আপনি অচল। একটি শিশুর জন্য দুধ গরম করতে গেলেও আপনার আগুন লাগবে। মাঝে মাঝে আগুন না পেয়ে আমাদের না খেয়েই ঘুমাতে হয়।”