অধিকৃত পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর পরিবর্তে বেসামরিক পুলিশকে বেসামরিক আইন প্রয়োগের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের নির্দেশে এ পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপকে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে কার্যত সংযুক্ত করার প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) কাৎজ জানান, পশ্চিম তীরে বেসামরিক বিষয়সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা তৈরির জন্য সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আওতায় বেসামরিক বিষয় দেখভালের জন্য পুলিশের অধীনে একটি উপযুক্ত বাহিনী গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনি সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলা, সীমান্ত এবং ইসরায়েলি বসতিগুলোর নিরাপত্তায় বেশি মনোযোগ দেবে।
কাৎজের যুক্তি, পশ্চিম তীরে বেসামরিক বিষয় দেখভালের দায়িত্ব পুলিশের হাতে থাকা স্বাভাবিক। কারণ ইসরায়েলের অন্যান্য অঞ্চলেও এ ধরনের দায়িত্ব পুলিশই পালন করে। তবে এই ঘোষণা দেওয়ার আগে সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমন্বয় করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ইসরায়েল হায়োম’ অবশ্য জানিয়েছে, সেনাবাহিনী এই পরিবর্তনকে সমর্থন করেছে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিল।
পরিকল্পনাটি সম্পর্কে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও আগে থেকে অবগত ছিলেন না বলে জানা গেছে। তবে পশ্চিম তীরের কয়েকজন ইসরায়েলি বসতি নেতা কাৎজের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিনইয়ামিন আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান ইসরায়েল গানজ এ ঘোষণার পর অসলো চুক্তি বাতিল করে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আইন ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াই নেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাপ্রধান আইয়াল জামিরের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর ওপর বাড়তে থাকা দায়িত্বের চাপ কমাতে তিনি এমন প্রস্তাব দেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে জামির জানিয়েছিলেন, নতুন বসতি স্থাপনের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন কারণে পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব আরও বাড়ছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্রও জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের বিভাজন পর্যালোচনার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ চলছে। তবে পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অসলো চুক্তি অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের এরিয়া এ ও বি-তে বেসামরিক প্রশাসনের কিছু দায়িত্ব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে। অন্যদিকে এরিয়া সি-তে ইসরায়েলের বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে পুরো পশ্চিম তীর ইসরায়েলি সামরিক দখলের অধীনে থাকলেও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে অঞ্চলটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করেনি।
তবে গত এক বছরে পশ্চিম তীর পরিচালনায় ইসরায়েলের বেসামরিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা বাড়ানো এবং সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যগত কিছু দায়িত্ব কমিয়ে আনার মতো একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব পরিবর্তনকে কিছু বিশেষজ্ঞ ‘ডি-ফ্যাক্টো’ বা কার্যত সংযুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন।
এদিকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির মধ্যেই নতুন এই পরিকল্পনার ঘোষণা এসেছে। সম্প্রতি নাবলুসের দক্ষিণে কুসরা গ্রামে বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শুক্রবার পর্যন্ত তারা ওই এলাকায় অবস্থান করছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষক রন বেন-ইশাই দাবি করেছেন, পশ্চিম তীরে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও শিন বেতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং উগ্রপন্থী বসতিস্থাপনকারীদের একটি অংশ সেখানে কার্যত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। তার মতে, কাৎজের ঘোষণাটি পশ্চিম তীরে ‘ডি-ফ্যাক্টো সংযুক্তির’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন দায়িত্ব পালনের জন্য ইসরায়েলি পুলিশের পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে কি না।