আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির দুই প্রধান আরব রাজনৈতিক জোট—ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আম (Ra’am) এবং জয়েন্ট লিস্টকে (Joint List) নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। একই সঙ্গে হাদাশের আইনপ্রণেতা ওফের কাসিফ এবং বালাদের নেতা সামি আবু শেহাদেহকেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়; দলগুলোর আপিল এবং ব্যক্তিগত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনার পরই চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারিত হবে।
২৩ সেপ্টেম্বর দিনভর শুনানির পর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট—উভয় দলকে ১৮-৫ ভোটে অযোগ্য ঘোষণা করে। রা’আমের নেতৃত্বে রয়েছেন মানসুর আব্বাস। আর জয়েন্ট লিস্টে হাদাশ, তা’আল ও বালাদ—এই তিন আরব নেতৃত্বাধীন দলের প্রার্থীরা রয়েছেন। দল দুটির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অস্তিত্বকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অস্বীকার করা, বর্ণবাদে উসকানি এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থনের মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ব্যক্তিগত প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও পৃথক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওফের কাসিফকে ১৯-৫ ভোটে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। আর সামি আবু শেহাদেহর ক্ষেত্রে ৩১-৪ ভোটে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি। আবু শেহাদেহর বিরুদ্ধে বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত একটি নিবন্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন থাকার অভিযোগ সামনে আনা হয়। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারা অন্য দল ও প্রার্থীদের ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণার জন্য পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি না পাওয়ার কথা জানালেও আবু শেহাদেহর ওই লেখাটি গুরুতরভাবে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন।
আরব দলগুলোর আইনি প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন আদালাহ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, রা’আমের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম সমর্থনের কোনো প্রমাণ নেই এবং জয়েন্ট লিস্টের বিরুদ্ধেও পুরোনো নথি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ভিত্তি করে অভিযোগ আনা হয়েছে। আবু শেহাদেহর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নিবন্ধে সহিংসতার কোনো আহ্বান ছিল না। তিনি নিজেও সশস্ত্র সংগ্রামের বিরোধিতা করার কথা জানিয়েছেন।
দল ও প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ‘বেসিক ল: দ্য নেসেট’-এর ৭এ ধারা প্রযোজ্য। এই বিধান অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অস্বীকার করলে, বর্ণবাদে উসকানি দিলে অথবা কোনো শত্রু রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী সংগঠনের হয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন করলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্ট অতীতে এই বিধানের প্রয়োগে উচ্চ মাত্রার প্রমাণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
রা’আমের বিরুদ্ধে অযোগ্য ঘোষণার আবেদন করেছিল লিকুদ, ওৎজমা ইয়াহুদিত এবং Choosing Life Forum। জয়েন্ট লিস্ট ও ওফের কাসিফের বিরুদ্ধে আবেদন করে লিকুদ। আর সামি আবু শেহাদেহকে অযোগ্য ঘোষণার আবেদন করে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের দল ওৎজমা ইয়াহুদিত।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আরব দলগুলোর আইনি প্রতিনিধিরা। রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে। অন্যদিকে কাসিফ ও আবু শেহাদেহর মতো ব্যক্তিগত প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা কার্যকর করতে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন। এসব মামলার শুনানি আগামী সপ্তাহে হওয়ার কথা রয়েছে।
বিষয়টি ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ আরব রাজনৈতিক দলগুলো দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এর আগে ২০২১ সালে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত জোট সরকারে যোগ দিয়েছিল। ওই জোটের মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের নেতানিয়াহু সরকারের বাইরে একটি সরকার গঠিত হয়েছিল। ফলে আরব দলগুলোর আসন ও সমর্থন ইসরায়েলের জোট গঠনের সমীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসন সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট জোটের সমর্থনে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ইসরায়েলের বিভিন্ন বিরোধী দলের মধ্যেও আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠন বা সহযোগিতা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। ফলে রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, সে সিদ্ধান্ত শুধু তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয় নয়; এটি আসন্ন কনেসেট নির্বাচনের সম্ভাব্য জোট-সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্তের পর এখন বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনা। আদালত সংশ্লিষ্ট দল ও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ আইনি অযোগ্যতার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে কি না, সেটিই বিবেচনা করবে। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে রা’আম, জয়েন্ট লিস্ট, ওফের কাসিফ ও সামি আবু শেহাদেহ ব্যালটে থাকবেন কি না।