সুপ্রিম কোর্টের অবকাঠামো ও বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়নে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। তবে এই অর্থ ব্যয়ের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব প্রকল্প অনুমোদন ও আর্থিক ক্ষমতা না থাকায় বরাদ্দের অর্থ এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে অনূর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরিপত্র জারির দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন গত ১৭ আগস্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বিষয়টিকে ‘অতীব জরুরি’ উল্লেখ করা হলেও এক মাসের বেশি সময় পরও সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করা না গেলে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে চিঠি দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতের সংরক্ষিত বরাদ্দ থেকে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বাজেটে ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতির কথা জানায়। একই সঙ্গে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ২০২২ সালের সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পসংক্রান্ত নির্দেশিকা এবং প্রচলিত আর্থিক বিধি অনুসরণের শর্ত দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অধস্তন আদালতের অবকাঠামোতে দীর্ঘদিনের সংকট রয়েছে। অনেক আদালত ভবন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। পর্যাপ্ত স্থাপনা না থাকায় বিচারিক নথি ও মামলার আলামত সংরক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে। এজলাসের সংকটের কারণে কোথাও কোথাও বিচারকদের এজলাস ভাগ করে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আদালতের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
সমস্যার একটি বড় কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সালের সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনসংক্রান্ত নির্দেশিকায় বিচার বিভাগের প্রধান বা সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে প্রকল্প প্রণয়ন, যাচাই, অনুমোদন ও সংশোধনের বিভিন্ন কমিটিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রতিনিধিত্ব থাকছে না। এ অবস্থায় বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রচলিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিনিয়োগ প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা পরিকল্পনামন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর কাছে রয়েছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাঠানোর বিধান রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় সংসদ, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ভূমিকা রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কাঠামোতে পৃথক সচিবালয় না থাকায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের নাম সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। ইতিবাচক মতামত পাওয়া গেলে পরিপত্র সংশোধন করা হবে। অন্যথায় আগামী মাসের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বিষয়টির সমাধান হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসন তাদের চিঠিতে অনূর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পসংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটিতে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে। তাদের মতে, বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত এগিয়ে নিতে বিদ্যমান নির্দেশিকায় প্রয়োজনীয় সংশোধন জরুরি।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রধান বিচারপতির আর্থিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রকল্প অনুমোদনের জটিলতা দ্রুত নিরসনের পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে সিনিয়র আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেনের মতে, বিচার বিভাগের প্রকল্প ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।