আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইভআরে (Fiverr) সংঘবদ্ধভাবে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, কৃত্রিম রিভিউ তৈরি এবং বাজার কারসাজির গুরুতর অভিযোগে সংকটের মুখে পড়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘বিটোপিয়া গ্রুপ’ (সাবেক বিডি কলিং আইটি)। প্রতিষ্ঠানটির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক প্রমাণ মেলায় ইতোমধ্যেই তাদের পরিচালিত প্রায় ৩০০টি ফাইভআর অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েক হাজার অ্যাকাউন্টকে আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মটি কঠোর নজরদারি ও তদন্তের আওতায় এনেছে। এই ঘটনার জেরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং দেশের উঠতি ফ্রিল্যান্সিং খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিটোপিয়া গ্রুপ কর্মী নিয়োগের সুযোগ নিয়ে তাদের পাঁচ হাজারের বেশি কর্মীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও পাসপোর্টের তথ্য সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে কর্মীদের অজান্তে বা তাদের বাধ্য করে সেসব ব্যক্তিগত তথ্যে ফাইভআর অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। এসব অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার হাতে। সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরও তারা নিজেদের নামে খোলা অনলাইন প্রোফাইলের নিয়ন্ত্রণ ফেরত পাননি। ফাইভআরের নীতিমালায় থার্ড-পার্টি কর্তৃক অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে ‘ফেক আইডেন্টিটি’ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
অ্যাকাউন্ট দখলের পাশাপাশি প্রতিযোগী ফ্রিল্যান্সারদের ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। সম্প্রতি জানা যায়, বিটোপিয়ার নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফ্রিল্যান্সারদের গিগে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ দিয়ে তা বাতিল করা হতো, যাতে ওই ফ্রিল্যান্সারদের প্ল্যাটফর্ম র্যাংকিং নিচে নেমে যায়। এ ছাড়া নিজেদের গিগের অবস্থান ও কাজের সুযোগ বাড়াতে ভুয়া অর্ডার ও ফেক রিফান্ডের অপকৌশল ব্যবহার করত তারা। বিতর্কিত এই প্রক্রিয়ায় বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর সম্পন্ন করা প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের কাজ বাতিল করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গত আগস্টের শুরুতে ফাইভআরের বাংলাদেশ অংশের কমিউনিটি ফোরামে একটি বিশেষ সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে জানানো হয়, অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ভুয়া রিভিউ ও অর্ডারের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মের সুনাম ক্ষুণ্নকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। নীতি লঙ্ঘনকারী এসব অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতেও এ ধরনের কারসাজি ঠেকাতে তাদের অ্যালগরিদম আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দেয় ফাইভআর।
বিটোপিয়ার এমন কর্মকাণ্ডে ফ্রিল্যান্সিং খাতের সংশ্লিষ্টরা চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একটি মাফিয়া চক্রের মতো পরিচালনা করা এই স্ক্যামের কারণে সাধারণ ও প্রকৃত ফ্রিল্যান্সারদের প্রোফাইলগুলোও এখন বাড়তি নজরদারি ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নির্দোষ তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল আলিম জানান, তরুণদের এই সম্ভাবনাময় খাতকে যারা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, বিটোপিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ মনির হোসেন ফ্রিল্যান্সিং ব্যবসার ঝামেলার কথা উল্লেখ করে এই খাত থেকে সরে অন্য ব্যবসায় স্থানান্তরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।