শরয়ী মসজিদ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় যেসব মাসআলা জানা জরুরি
শরয়ী মসজিদ প্রতিষ্ঠা, ওয়াকফ সম্পত্তি, পরিচালনা কমিটি, ইমাম-মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব, মাদরাসার কার্যক্রম ও দ্বিতীয় জামাতসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানুন।
- আপলোড সময় : ১৫-১০-২০২৬ ১১:২১:৪৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৫-১০-২০২৬ ১১:২১:৪৬ পূর্বাহ্ন
- ৫ মিনিট পড়ার সময়
- ২৮ বার পঠিত
প্রতীকী ছবি- ( সংগৃহীত)
মাওলানা জুবায়ের হাসান
মাসআলা ১.
মসজিদের নির্দিষ্ট জায়গা শুধুমাত্র মসজিদের জন্য স্পষ্টভাবে ওয়াকফকৃত হতে হবে। যদি জমিন না হয়ে কোন ফ্ল্যাট বা ফ্লোর মসজিদের জন্য ওয়াকফ করা হয় তাতেও শরয়ী মসজিদের হুকুম সাব্যস্ত হয়ে যাবে। কোনো জমিন যদি মসজিদের নামে ওয়াকফকৃত হয়ে যায়, এবং সেখানে নামায আদায় শুরু হয়ে যায়, অর্থাৎ মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জায়গায় নিচতলা থেকে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হলে ঐ স্থানের উপর-নিচ পুরোটা মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। উক্ত অবস্থায় যমিন থেকে আসমান পর্যন্ত সম্পূর্ণটা মসজিদ। সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে নিচ তলায় দোকানপাট, টয়লেট, অযুখানা, গাড়ীর গ্যারেজ ইত্যাদি ও দোতলায় মসজিদ অথবা নিচতলায় মসজিদ ও দোতলায় ইমাম, মুআজ্জিনের থাকার রুম তৈরি করা কোনোটাই জায়েয হবে না। -আল মুহীতুল বুরহানী ৯/১২৮, ১৩৭; আলবাহরুর রায়েক ৫/২৫১; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/২৯৩; রদ্দুল মুহতার ৪/৩৫৮
উল্লেখ্য, সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্তৃপক্ষ যদি মৌখিকভাবে কোনো স্থানকে নামায আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়, এবং সেখানে নামায আদায় শুরু হয়ে যায়, তাহলে সেখানেও শরয়ী মসজিদের হুকুম সাব্যস্ত হয়ে যাবে।
মাসআলা ২.
যে জায়গায় একবার শরয়ী মসজিদ স্থাপন হয় সেই জায়গা কেয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য মসজিদ হয়ে যায়, উক্ত মসজিদ স্থানান্তরিত করা জায়েয নেই, এবং কোনোক্রমেই উক্ত জায়গা মসজিদ ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা বৈধ হবে না।
মাসআলা ৩.
মসজিদ একটি ওয়াকফ সম্পত্তি, আর ওয়াকফ সম্পত্তির মালিকানা মানুষের কাছে থাকেনা বরং তার মালিকানা আল্লাহর কাছে চলে যায়, সুতরাং যিনি মসজিদ দেখাশুনার দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। (যেমনঃ- মুতাওয়াল্লি, সভাপতি) তার জন্য উচিত ওয়াকফকৃত সম্পত্তি ব্যবহারের পরিপূর্ণ মাসআলা জেনে নেওয়া, অন্যথায় আল্লাহ তায়ালার কাছে এর জবাবদিহি করতে হবে।
মাসআলা ৪.
মসজিদ কিংবা যে কোনো দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের জন্য শরীয়তের অনুসারী, দ্বীনদার, আমানতদার, সৎ ও খোদাভিরু হওয়া আবশ্যক। সুতরাং প্রকাশ্যে গুনাহে লিপ্ত, খেয়ানতকারী ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে মসজিদ কমিটি গঠন করা একেবারেই অনুচিত। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২/৪০৮
মাসআলা ৫.
মসজিদ সংক্রান্ত বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা প্রদানের ক্ষমতার অধিকারী মুতাওয়াল্লি বা সভাপতি। যোগ্যতার ভিত্তিতে যিনি মুতাওয়াল্লি বা সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি উপস্থিত কমিটির সকল সদস্যের পরামর্শক্রমে প্রতিষ্ঠানের জন্য যেটা অধিক কল্যাণকর মনে করেন, সে অনুপাতে ফায়সালা প্রদান করবেন।
মাসআলা ৬.
ইমাম সাহেবকে অধীন মনে করা যাবে না। তাকে কর্মচারী মনে করে তার সাথে নিজেদের কর্মচারীর ন্যায় আচরণ করা জায়েয নয়। কারণ, তিনি হুযুর (সা.) এর ওয়ারিস। তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করা ঈমানের অঙ্গ। শরয়ী কোনো কারণ ব্যতীত তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করা ঈমানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। -ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ২/৪৫২
মাসআলা ৭.
কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত মসজিদে দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গের জন্য দায়িত্ব অবহেলা করা জায়েয হবে না। এ ক্ষেত্রে যে পরিমাণ দায়িত্ব অবহেলা করা হয়েছে, সে পরিমাণ বেতন মূল বেতন থেকে কর্তন করে কর্তৃপক্ষকে ফেরত দিতে হবে, তা গ্রহণ করা না জায়েয। (উদাহরণস্বরূপ মসজিদের ইমামের দায়িত্ব হলো, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ইমামতি করা, এখন যদি কোনো ইমাম কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত দৈনিক চার ওয়াক্ত নামাযের ইমামতি করে ও এক ওয়াক্ত বাদ দেয়, তাহলে তার বেতনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ তার জন্য গ্রহণ করা হারাম। উক্ত এক ভাগ কর্তৃপক্ষকে ফেরত দেওয়া আবশ্যক।
অনুরূপভাবে মসজিদের খাদেমের দায়িত্ব হলো, দৈনিক দুই বার মসজিদ ঝাড়ু দেওয়া, এখন যদি কোনো খাদেম কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত দৈনিক এক বার ঝাড়ু দেয়, দ্বিতীয়বার না দেয়, তাহলে তার জন্য পূর্ণ বেতন গ্রহণ করা নাজায়েয।) -ফাতাওয়া উসমানী ২/৩৪৫।
মাসআলা ৮.
মসজিদের যেকোনো ক্ষয়-ক্ষতি, বিশৃঙ্খলা ও মসজিদের বে-হুরমতি সবকিছুর দায়ভার যিনি মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তির দায়িত্ব নিয়েছেন তার ওপর বর্তাবে, অর্থাৎ মুতাওয়াল্লি/সভাপতি। সুতরাং মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যেন তাদের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে, এ ব্যাপারে মুতাওয়াল্লি/সভাপতিকে তৎপর হতে হবে। -আহকামে মাসাজিদ, মুফতি আব্দুর রহমান।
মাসআলা ৯.
মসজিদের কোনো কাজে হারাম মাল ব্যবহার করা নাজায়েয। যদি জানা যায় যে, মসজিদের কাজে হারাম মাল ব্যবহার হয়েছে, তাহলে তাৎক্ষণিক মসজিদ কমিটি তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিবে। অর্থাৎ হারাম সম্পদ’ দাতাকে ফিরিয়ে দিবে।
মাসআলা ১০.
ওয়াকফকৃত জমিনে মসজিদ স্থাপন হয়ে গেলে সেই মসজিদে স্থায়ীভাবে মাদরাসা স্থাপন করা জায়েয নেই। যেমন, কোনো কোনো মসজিদে এমন হয়ে থাকে যে, নিচতলা মসজিদ ও দোতলা মাদরাসা এমনটি জায়েয নেই। মূলত দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের জন্য মাদরাসা স্থাপন করা এলাকাবাসীদের নৈতিক দায়িত্ব, সুতরাং মাদরাসার জন্য পৃথক জায়গা নিয়ে সেখানে দ্বীনি মাদরাসা স্থাপন করা চাই। মাদ্রাসা যেহেতু মসজিদেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান, সেই হিসেবে ফুকাহায়ে কেরাম ৩টি শর্তের সাথে মসজিদে অস্থায়ী মাদরাসা চালু করার অনুমতি দিয়েছেন।
(ক)
স্বতন্ত্র মাদরাসা স্থাপন করা চাই, মাদরাসা স্থাপনের আগ পর্যন্ত মসজিদে অস্থায়ীভাবে বাচ্চাদের দ্বীনি তালিম দেওয়া যেতে পারে। এবং মসজিদে বাচ্চাদের আবাসিক থাকা কোনোক্রমেই জায়েয হবে না।
(খ)
যেসব বাচ্চারা লেখাপড়া করবে তারা হুঁশিয়ার ও বুঝমান হতে হবে, এবং মসজিদের আদবের প্রতি পুরোপুরি লক্ষ্য রাখে এমন হতে হবে।
(গ)
ওস্তাদগণ শিক্ষাদানের সময় ই'তিকাফের নিয়ত করে নিবে। -ফাতাওয়া উসমানী ২/৫২৪
মাসআলা ১১.
যে মসজিদে নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম-মুআজ্জিন আছে এবং জামাতের সময় নির্ধারিত আছে, সেই মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহে তাহরীমি অর্থাৎ নাজায়েয। এমনকি তারাবীর নামাযেরও দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহ, যদিও মুসল্লা (তথা ইমামের দাঁড়ানোর স্থান) ভিন্ন হয়। সুতরাং ঢালাওভাবে মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। তবে যদি কোনো ব্যক্তি মূল জামাতে শরীক হওয়ার উদ্দেশ্যে মসজিদে এসে দেখে যে, জামাত শেষ হয়ে গেছে, এবং তার মতো অনুরূপ দুই/তিন জন মুসল্লিও যদি পাওয়া যায়, তাহলে ডাকাডাকি ও আয়োজন ব্যতীত ২/৩ জন মিলে আলাদা জামাত করার অবকাশ আছে। তবে এক্ষেত্রে একামত দিবে না। -দরসে তিরমিযী ২/১৩৫
প্রকাশ থাকে যে, যদি কোনো মসজিদের পার্শ্বে দ্বিতীয় জামাতের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করা থাকে তাহলে সেখানে ওজর বশঃত দ্বিতীয় জামাত কায়েম করার অনুমতি আছে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।