আমাদের দেশের প্রায় সব এলাকায় টাকার বিনিময়ে জমি বন্ধক দেয়ার প্রচলন রয়েছে। এক্ষেত্রে সাধারণত জমি বন্ধকের দুটি পদ্ধতির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।
এক. কেউ নির্ধারিত পরিমাণ টাকার বিনিময়ে কারো কাছ থেকে জমি বন্ধক নেয়। সাধারণত কত বছরের জন্য বন্ধক নেয়া হলো তা উল্লেখ থাকে না। টাকাদাতা জমি ভোগ করতে থাকে। এভাবে দু-চার বছর চলে যায়। এরপর জমির মালিক টাকাদাতার মূল টাকা ফিরিয়ে দিয়ে নিজের জমি ফিরিয়ে নেয়।
দুই. এটিও উপরিউক্ত পদ্ধতির মতোই। তবে পার্থক্য হলো, এক্ষেত্রে যখন টাকা ফিরিয়ে দেয় তখন বছর হিসাব করে বন্ধকগ্রহীতা কিছু টাকা কম নেয়। যেমন, কেউ বিশ হাজার টাকায় কারো থেকে পাঁচ কাঠা জমি বন্ধক নিল। অতঃপর সে দু’বছর ওই জমি ভোগ করল। দু’বছর পর টাকা ফিরিয়ে নেওয়ার সময় পাঁচশ টাকা করে এক হাজার টাকা অথবা মূল টাকার ৫% কিংবা ১০% টাকা কম নেয়। কোনো কোনো এলাকায় জমি বন্ধকের এই রীতিকে ‘জমি কট দেওয়া’ বলা হয়। আবার কোথাও ‘জমি খায়খালাসি দেওয়া’ও বলা হয়ে থাকে।
অনেকে জানতে চান যে, জমি বন্ধকের প্রচলিত এ পদ্ধতিগুলো বৈধ কি না? নিম্নে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
ঋণদাতার জন্য বন্ধকি বস্তু ব্যবহার করা বা তা থেকে কোনো উপায়ে উপকৃত হওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয। এটি মূলত ঋণ প্রদান করে বিনিময়ে সুদ গ্রহণেরই একটি পদ্ধতি। হযরত ফাযালা ইবনে উবাইদ রা. বলেন-
ﻛﻞ ﻗﺮﺽ ﺟﺮ ﻣﻨﻔﻌﺔ ﻓﻬﻮ ﻭﺟﻪ ﻣﻦ ﻭﺟﻮﻩ اﻟﺮﺑﺎ
‘যেই ঋণ কোনো মুনাফা নিয়ে আসে তা রিবার প্রকারসমূহের একটি।’ -সুনানে বাইহাকী ৫/৩৫০
তাবেয়ী ইবনে সীরীন রহ. বলেন, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর নিকট এসে বলল, এক লোক আমার নিকট একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে, অতঃপর আমি তাতে আরোহণ করেছি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন- مَا أَصَبْتَ مِنْ ظَهْرِهَا فَهُوَ رِبًا. ‘তুমি উক্ত ঘোড়ার উপর আরোহণ করে যে উপকার গ্রহণ করেছ তা সুদ হয়েছে।’ -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা: ১৫০৭১
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আরো বলেন- ﻣﻦ ﺃﺳﻠﻒ ﺳﻠﻔﺎ ﻓﻼ ﻳﺸﺘﺮﻁ ﺃﻓﻀﻞ ﻣﻨﻪ، ﻭﺇﻥ ﻛﺎﻧﺖ ﻗﺒﻀﺔ ﻣﻦ ﻋﻠﻒ ﻓﻬﻮ ﺭﺑﺎ ‘যে ব্যক্তি কাউকে ঋণ দিবে সে যেন অতিরিক্ত কোনো কিছু শর্ত না করে। যদিও এক মুঠো ঘাস হোক না কেন।’ -মুআত্তা মালেক, হাদীস: ২৫১৩
বিখ্যাত তাবেয়ী কাযী শুরাইহ রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সুদ পান করা কীভাবে হয়ে থাকে? তিনি বললেন- اﻟﺮﺟﻞ ﻳﺮﺗﻬﻦ اﻟﺒﻘﺮﺓ ﺛﻢ ﻳﺸﺮﺏ ﻟﺒﻨﻬﺎ ‘গাভি বন্ধক রেখে বন্ধকগ্রহীতার জন্য তার দুধ পান করা সুদ পানের অন্তর্ভুক্ত।’ -মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস : ১৫০৬৯
সুতরাং উল্লিখিত প্রথম পদ্ধতি নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিটিও বৈধ নয়। এটি মূলত ঋণ প্রদান করে বন্ধকি জমি ভোগ করার একটি ছুতা মাত্র। কারণ এক্ষেত্রে আলাদাভাবে ‘ইজারা’ বা ভাড়া চুক্তি করা হয় না; বরং জমি ভোগ করার শর্তেই ঋণ দেওয়া হয় এবং ঋণের সুবিধা পাওয়ার কারণেই জমির মালিক নামমাত্র টাকা ভাড়া হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। সকলেই জানে যে, জমির মালিককে ঋণ না দেয়া হলে সে এত কম মূল্যে জমি ভাড়া দিত না। সুতরাং জমি বন্ধকের উল্লিখিত দুটি পদ্ধতিই নাজায়েয। অতএব এমন কারবার করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
বাড়ি বন্ধক রীতি :
জমি বন্ধকের মতোই ঢাকা শহরে বাড়ি বন্ধকের প্রথা চালু হয়েছে। তা হলো, বাড়িওয়ালা নিজ প্রয়োজনে কারো থেকে ৫ বা ১০ লক্ষ টাকা ঋণ নেয়। বিনিময়ে পাঁচ বছর বা দশ বছরের জন্য ঋণদাতাকে তার বাড়ি বা ফ্ল্যাটে বিনা ভাড়ায় থাকার সুযোগ দেয়। পরবর্তীতে যখন ঋণ পরিশোধ করে দেয় তখন এই চুক্তি সমাপ্ত হয়। এই লেনদেনও সম্পূর্ণ সুদী কারবারের অন্তর্ভুক্ত, যা সুস্পষ্ট হারাম। কেননা ঋণ প্রদানের কারণেই মূলত ঋণদাতা বিনা ভাড়ায় বাড়ি ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে।
প্রচলিত জমি বন্ধক পদ্ধতির বৈধ বিকল্প :
জমির বিনিময়ে বৈধ পন্থায় টাকা নিতে চাইলে বন্ধকি চুক্তি না করে শুরু থেকেই দীর্ঘমেয়াদি ভাড়া বা লীজের চুক্তি করবে। যার বিবরণ এই যে, জমির মালিক জমি ভাড়া দিবেন। তার যত টাকা প্রয়োজন সেজন্য যত বছর ভাড়া দিতে হয় একত্রে তত বছরের জন্য তা ভাড়া দিবেন। যেমন, ধরা যাক এক বিঘা জমির বার্ষিক ভাড়া ৫ হাজার টাকা। জমির মালিকের ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। তাহলে তিনি ৪ বছরের জন্য জমি ভাড়া দিয়ে অগ্রিম ভাড়া বাবদ ২০ হাজার টাকা নিয়ে নিবেন। এক্ষেত্রে জমির ভাড়া স্থানীয় ভাড়া থেকে সামান্য কম বেশিও হতে পারে। এরপর ভাড়ার মেয়াদ শেষ হলে অর্থদাতা জমি ফেরত দিবেন, কিন্তু প্রদত্ত টাকা ফেরত পাবেন না।
অবশ্য কোনো কারণে যদি ভাড়ার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভাড়াগ্রহীতা জমি ফেরত দেন বা পারস্পরিক সম্মতিতে ভাড়া চুক্তি বাতিল করা হয় তাহলে যে কয়দিন জমিটি ভাড়ায় ছিল সে পরিমাণ ভাড়া কর্তন করে অবশিষ্ট টাকা ভাড়াগ্রহীতা ফেরত পাবেন।
আর কেউ না জেনে অবৈধ পন্থায় জমি বন্ধক দিয়ে থাকলে তার কর্তব্য হবে, উক্ত বন্ধকি চুক্তি বাতিল করে উপরিক্ত নিয়মে ‘ইজারা’ বা ভাড়া চুক্তি করা। অর্থাৎ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে জমির একটা ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণ করে নিবে। অতঃপর সে অনুযায়ী যতদিন ইচ্ছা টাকাদাতা জমিটি ইজারা পদ্ধতিতে ভোগ করবে। আর প্রদত্ত টাকা থেকে নির্ধারিত ভাড়া কর্তন হতে থাকবে।
-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৮/২৪৪-২৪৫; শরহু মুখতাসারিত তহাবী ৩/১৪৯; -আননুতাফ ফিল ফাতাওয়া পৃ. ২৯৬; বাদায়েউস সানায়ে ৫/২১২; রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/২৩৬; শরহুল মাজাল্লা, খালেদ আতাসী ৩/১৯৬; আলফুলকুল মাশহুন (মাজমুআতু রাসাইলিল লাখনবী ৩/৪১২); ইলাউস সুনান ১৮/৬৪; ইমদাদুল আহকাম ৩/৫১৮