সদ্য খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণকারী—নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় সহচর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. যখন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এ ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন গোটা আরব ভূ-খণ্ডে ছিল অস্থিরতা আর অস্থিরতা। একদিকে প্রিয় নবীর তিরোধানের ক্ষত তখনো দগদগে, হৃদয়ের অবিরাম রক্ত ক্ষরণে দিশেহারা সাহাবায়ে কেরাম। অন্যদিকে ইয়ামান, মক্কা ও মদীনার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে মুরত|দ হতে লাগল নও মুসলিম লোকজন। হাজার হাজার ভক্ত নিয়ে ভণ্ড নবী তুলাইহা মুসাইলামারা ঘোষণা করল, ‘কুরাইশের নবীর তিরোধান হলেও আসাদ ও হানাফিয়া গোত্রের নবীরা এখনো জীবিত।’
কিছু অঞ্চলের মানুষ যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানাল। আরব ভূ-খণ্ডের ঈশানকোণের যেন ফিতনার কালো মেঘ জমছে। ইতিহাসের এ চরম যুগসন্ধিক্ষণে জ্বলে উঠল খলীফাতুর রাসূল হযরত আবু বকর রাযি.-এর ঈমানদীপ্ত কণ্ঠ— أينقص الدين وأنا حي؟ ‘দ্বীনের অঙ্গহানী হবে, আর আমি জীবিত থাকব?’ নিজেদের আবাসভূমিই যখন বহির্শত্রুর আক্রমণের সম্মুখীন তখনও যে নবীর সিদ্ধান্তে অনঢ় থাকা যায় এবং মূল সেনাদলকে বাইরের অভিযানে পাঠিয়ে সে সিদ্ধান্তের মর্যাদা রাখা যায়, তার দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন হযরত আবু বকর রাযি.।
বলাবাহুল্য, অপরিসীম ভালবাসা, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আর নবীর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের কারণেই এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। তাঁর ইস্পাত—দৃঢ় সংকল্পের পরিচয় নিম্নোক্ত বাণী থেকে পাওয়া যায়—
والذي نفسي بيده لو ظننت السباع تخطفني لأنفذت جيش أسامة كما أمر به رسول الله صلى الله عليه وسلم، ولو لم يبق في القرى غيري لأنفذته. ‘ওই সত্ত্বার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, যদি আমার এই আশঙ্কা হতো যে, আমাকে হিংস্র বাঘের থাবার মুখোমুখি হতে হবে এবং গোটা নগরীতে আমি ছাড়া আর কেউ জীবিত না থাকত তবুও আমি প্রিয় নবীর নির্দেশ মতো ‘জায়শে উসামা’কে অভিযানে প্রেরণ করতাম।’
এটি হল সাহাবায়ে কেরামের সীরাত—চর্চার একটি নমুনা।
নবী—সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা ও আনুগত্যের একটি অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।
সময়ের ব্যবধানে সীরাত—চর্চার ধরন—ধারণে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সীরাতকে কেন্দ্র করে নানা আনুষ্ঠানিকতার উদ্ভব ঘটেছে এবং নবী—প্রেমের দাবিও আগের তুলনায় অনেক বেশি শ্রুতিগোচর হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, বাস্তব জীবনে নবী—আদর্শের চর্চা দিন দিন কমেই চলেছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নবীর আদর্শ অবহেলিত হচ্ছে। তাহলে এত জৌলুসপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার ফলাফল কী দাঁড়াল?
তাই সীরাত—চর্চার সবক আমাদের আবার নতুন করে নিতে হবে সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে, যারা ছিলেন প্রকৃত নবী প্রেমিক এবং নবী—আদর্শের ছাঁচে যারা তাদের জীবন ও কর্মকে গড়ে তুলেছিলেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন— من كان منكم متأسيا فليتأس بأصحاب محمد صلى الله عليه وسلم، فإنهم كانوا أبر هذه الأمة قلوبا وأعمقها علما أقلها تكلفا، اختارهم الله لصحبة نبيه صلى الله عليه وسلم وإقامة دينه، فأقروا لهم فضلهم واتبعوهم في آثارهم، فإنهم كانوا على الهدى المستقيم. তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর সাহাবীগণকেই আদর্শরূপে গ্রহণ করো। কারণ হৃদয়ের পবিত্রতায়, ইলমের গভীরতায় এবং আড়ম্বরহীনতায় তাঁরা ছিলেন এ উম্মতের শ্রেষ্ঠ জামাত। আল্লাহ তাদেরকে আপন নবীর সাহচর্য এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য মনোনীত করেছিলেন। সুতরাং তোমরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করো এবং তাদের পথ অনুসরণ করো। নিঃসন্দেহে তাঁরাই ছিলেন সরল পথের পথিক। [3]
[1] সহীহ বুখারী, হাদীস : ৭২৮৪, ৭২৮৫; ইবনে আসাকির [2] আল—মুনতাযিম ৪/৭৪ [3] জামিু বয়ানিল ইলম ২/৯৭
সংগৃহীত: মুহাম্মাদ ত্বহা হুসাইন মাসিক আল কাউসার ||এপ্রিল ২০০৭