ঢাকা , বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল) , ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
সংবাদ শিরোনাম :
সেফটি ভালভ জটিলতা ও অগ্নিকাণ্ডে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলএনজি কিনছে পেট্রোবাংলা চাঁদপুরের ঐতিহাসিক বড় স্টেশন মাছঘাটে ইলিশের তীব্র সংকট ক্যাশলেস লেনদেন বাড়লে দুর্নীতি কমবে এবং ব্যবসার খরচ কমবে: অর্থমন্ত্রী উত্তরায় শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকার শপিং মলে ভয়াবহ আগুন হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনে দুর্ঘটনায় দুই সেনাসদস্য নিহত ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পাওনিয়ার বেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধি ও পিটিশন কমিটির সভাপতি হলেন স্পিকার আরব আমিরাতে ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে জাতিসংঘে সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশ ভারতের তিন আন্তঃদেশীয় ট্রেন ফের চালুর আলোচনা সুগন্ধি চাল রপ্তানির কোটা ৫০ শতাংশ কমাল সরকার সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, জানাল হুতি গণমাধ্যম মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি আইআরজিসির দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা এআইয়ের ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বাড়ছে অনলাইন প্রতারণা বিদ্যুৎ নিয়ে কটূক্তিতে গ্রেপ্তার সিফাত আব্দুল্লাহর জামিন নামঞ্জুর এক ঠিকানায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি তথ্য নিয়ে এলো ‘অ্যাডমিশন হাব’ নোয়াখালীতে ভুল চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের এমডি কারাগারে

সেফটি ভালভ জটিলতা ও অগ্নিকাণ্ডে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে

সেফটি ভালভের ত্রুটি এবং পাইওনিয়ার বেইজের অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরু হওয়ার সময় আরও পেছাচ্ছে।
নিউজটি শুনুন
  • আপলোড সময় : ০৯-০৯-২০২৬ ১০:০৭:০৭ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৯-০৯-২০২৬ ১০:০৭:০৭ অপরাহ্ন
  • ৫ মিনিট পড়ার সময়
  • ১৫ বার পঠিত
সেফটি ভালভ জটিলতা ও অগ্নিকাণ্ডে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ছবি: সংগৃহীত
তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশের মানুষ তাকিয়ে ছিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে। আশা ছিল, সেপ্টেম্বরে মিলবে পারমাণবিক বিদ্যুতের সুফল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ‘সেফটি ভালভ’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় আবারও পিছিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে প্রকল্পের পাইওনিয়ার বেইজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রটি চালু করতে এরই মধ্যে অনেক সময় লেগে গেছে। দ্রুত উৎপাদনে যেতে না পারায় জাতীয় অর্থনীতি ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
 
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিং ও ব্যয় কমাতে এই মুহূর্তে রূপপুরের বিদ্যুৎ অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো বিদ্যুৎ না আসায় জাতীয় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
 
রাশিয়ার পরমাণু প্রকৌশল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই ইউনিট-১ চালুর লক্ষ্যে ইউনিট-২ থেকে একটি পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি) স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিকল্প ভালভ স্থাপন সম্ভব না হলে কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদন আরও অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে।
 
গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, সেফটি ভালভে ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে কবে সমস্যার সমাধান হবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।
 
জটিলতা কাটাতে চলছে নতুন উদ্যোগ:
 
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেফটি ভালভ রিঅ্যাক্টরের ভেতরের চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে অতিরিক্ত চাপ নিরাপদে বের করে দেয়। রূপপুরে এই ভালভটি এক মাসের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এখন পুনরায় পরীক্ষা ও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
 
কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের ভালভ তৈরি করতে সাধারণত ছয় থেকে আট মাস সময় লাগে। বর্তমান ভালভ ব্যবহার করা সম্ভব হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে আরও প্রায় ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ লাগতে পারে। নতুন ভালভ তৈরি করতে হলে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হবে।
 
রসাটমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই জানিয়েছে, সমস্যাটি কারিগরিভাবে জটিল। নির্দিষ্ট রিঅ্যাক্টর ডিজাইনের জন্য তৈরি হওয়ায় বাজার থেকে সাধারণ কোনো ভালভ এনে এটি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। রুশ পক্ষের মতে, বিদ্যমান সরঞ্জাম পুনরায় সমন্বয় করাই আপাতত প্রধান সমাধান।
 
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাছান জানান, ভালভ স্থাপনের জন্য মঙ্গলবার রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল বাংলদেশে এসে পৌছেছে। বুধবার তারা প্রকল্প এলাকায় এসে কাজ শুরু করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
 
ইউনিট-১ ও ২-এর কাজেও বিলম্ব:
 
সেফটি ভালভের সমস্যার পাশাপাশি ইউনিট-১-এর আরও কিছু কাজ অসম্পন্ন রয়েছে। কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইউনিট-১-সংশ্লিষ্ট ৫৮টি স্থাপনার মধ্যে ৪৭টি বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ইউনিট-১-এর অস্থায়ী হস্তান্তর ডিসেম্বর ২০২৬-এ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
 
আগের সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এপ্রিলে ইউনিট-২-এ জ্বালানি লোডিং শুরুর কথা। এর আগে কমিশনিংয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা ও পরিদর্শন শেষ করতে হবে। তবে এসব কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ইউনিট-২ ডিসেম্বর ২০২৭-এর মধ্যে বাংলাদেশকে অস্থায়ীভাবে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
 
বিলম্ব কাটাতে অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। রুশ পক্ষও অসম্পন্ন কাজ শেষ করা, সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন ও ইউনিট-২ হস্তান্তরসহ পুরো কার্যক্রমের সমন্বিত সময়সূচি তৈরিতে সম্মত হয়েছে।
 
পাইওনিয়ার বেইজে গভীর রাতে অগ্নিকাণ্ড
এদিকে রূপপুর প্রকল্পের পাইওনিয়ার বেইজে রোববার দিবাগত রাত ৩টার দিকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) জিসিভি সার্ভাররুমসহ কয়েকটি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুড়ে গেছে কম্পিউটার, এসি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ইন্টারনেট সার্ভারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
 
খবর পেয়ে ঈশ্বরদী ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডের পর পাইওনিয়ার বেইজসহ আশপাশের দুটি ভবনে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
 
পাবনা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. সাদেকুল বারী জানান, প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের দায়িত্বশীল এক সূত্র জানায়, পাইওনিয়ার বেইজ রূপপুর প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের অংশ নয়; এটি একটি অক্সিলারী বা সহায়ক অংশ। অগ্নিকাণ্ডে প্রকল্পের মূল কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি এবং সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ঘটনাটি নাশকতা বা স্যাবোটাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
 
সময় পিছিয়েছে দফায় দফায়:
 
রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। মূল সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালুর কথা ছিল। করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে সময়সীমা কয়েক দফা পিছিয়েছে।
 
প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
 
প্রকল্প সূত্র জানায়, রূপপুর প্রকল্পে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ছয়শত বিদেশী নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। এদের মধ্যে বেশীরভাগই রুশ নাগরিক। এছাড়াও বেলারুশ, ইউক্রেন, কাজাখস্থান, ভারতসহ আরও দুটি দেশের নাগরিক রয়েছে।
 
এছাড়াও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনস্থ প্রায় ১ হাজার পাঁচশত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ১৪ হাজার শ্রমিক প্রকল্পের কাজে নিয়েজিত রয়েছেন।
 
রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশের কম-কার্বন বিদ্যুতের বড় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু সেফটি ভালভের সর্বশেষ জটিলতা এবং বারবার সময় পিছিয়ে যাওয়ায় দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
 
উৎপাদনে বিলম্বের কারণে কেন্দ্রটির যন্ত্রপাতির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল কমার পাশাপাশি বাংলাদেশ আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে রূপপুর এখন শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়—দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এটি বড় প্রত্যাশার নাম। সেই প্রত্যাশাই বারবার সময় পিছিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।