দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কৃষক চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, আবার কোথাও বেশি দাম দিলেই পর্যাপ্ত সার পাওয়া যাচ্ছে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশের কারসাজি এবং অবৈধভাবে সার মজুতের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, পাবনা, টাঙ্গাইল ও নাটোরে এমন পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের খানসামায় দুই দিনে ১ হাজার ৫৭৭ বস্তা এবং চট্টগ্রামে কোস্ট গার্ডের অভিযানে ৭০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি না থাকলে কোথাও প্রতি কেজি ইউরিয়া ৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়ার সরকারি মূল্য প্রতি কেজি ২৭ টাকা। অর্থাৎ ৫০ কেজির এক বস্তার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ডিলার পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্য প্রতি কেজি ২৫ টাকা। মনিডাকুয়া গ্রামের কৃষক সহিদার রহমান জানান, তিনি মেসার্স ভাই ভাই ফার্টিলাইজার স্টোর থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৩০ টাকা দরে কিনেছেন। এতে ৫০ কেজির এক বস্তার দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
রাজশাহীর চারঘাটেও কৃষকদের সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার কেনার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ডিলারের দোকানে সার থাকলেও কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কেউ কেউ চাহিদার তুলনায় খুব কম পরিমাণ সার দিচ্ছেন। ৫০ কেজি চাইলে ৫ বা ১০ কেজি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। কৃষক আকবর আলী জানান, বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যায়, কম দিলে পাওয়া যায় না। তার অভিযোগ, খুচরা বাজারে ইউরিয়া প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, টিএসপি ৩০ থেকে ৩২ টাকা এবং ডিওপি ২৮ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পাবনায়ও ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। ডিলারদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম। তবে কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের কাছ থেকে সার না পেলেও খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে তা কিনতে হচ্ছে। কোনো কোনো ডিলার সাব ডিলারদের কাছ থেকেও সারভেদে প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে খুচরা বিক্রেতারা আরও বেশি দামে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করছেন। পাবনা সদর উপজেলার কোমরপুরের কৃষক আজিম প্রামাণিক ও রাধাকান্তপুরের বাবলু খাঁ জানান, দুই বস্তা সার চাইলে তাদের ১০ কেজি দেওয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইল সদরের বড় বিন্নাফৈর গ্রামের কৃষক ফজলুর রহমান চলতি মৌসুমে চার বিঘা জমিতে রোপা আমন চাষ করেছেন। তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫০ টাকা দামের ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি সার তাকে ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। দাইন্যা ইউনিয়নের পাশাপাশি পোড়াবাড়ী, বাঘিল, গালা, ঘারিন্দা ও করটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি কেজি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা বিক্রির নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। একই সঙ্গে বাড়তি উৎপাদন খরচ ও ফসলের ন্যায্য দাম নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
নাটোরের সিংড়ায় অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার বিয়াশ বাজারের মেসার্স হামিদ এন্টারপ্রাইজে অভিযান চালিয়ে ২২০ বস্তা অবৈধভাবে মজুত করা সার পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হামিদুল ইসলামের ছেলে রাসেলকে সার ব্যবস্থাপনা আইনে ৩০ হাজার এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৪০ হাজার টাকা, মোট ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অপর এক কীটনাশক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা সার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি মূল্যে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া এলাকা থেকে মিয়ানমারে পাচারের প্রস্তুতিকালে ৭০০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ তিনটি ট্রাক জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড। বৃহস্পতিবার রাতে পরিচালিত অভিযানে পাচারের সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জব্দ সার ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় সন্দ্বীপের এক ডিলারের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম কোস্ট গার্ড।
দিনাজপুরের খানসামায় মজুত ও অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের অভিযানে দুই দিনে ১ হাজার ৫৭৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে সংশ্লিষ্টদের মোট ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং একটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এক ডিলারের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। শুক্রবার উপজেলার পাকেরহাট এলাকায় বিএডিসি সার ডিলার মহিতোষ চন্দ্র চন্দের মেসার্স মহাদেব ট্রেডার্সের গুদাম এবং টংগুয়া বাজারের মেসার্স আসাদুজ্জামান ট্রেডার্সে অভিযান চালানো হয়।