ভারতীয় পুরুষদের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসার নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সামাজিক সংকোচ ও রোগের লক্ষণ গোপন রাখার প্রবণতায় অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে রোগ শনাক্ত হচ্ছে। ভারতীয় কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পুরুষদের শীর্ষ ১০টি ক্যানসারের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসার অন্যতম। দিল্লি, বেঙ্গালুরু ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরে এ রোগের আক্রান্তের হার তুলনামূলক বেশি।
জাতীয় অনকোলজি রেজিস্ট্রিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত ৬০ শতাংশের বেশি পুরুষের ক্ষেত্রে রোগটি মেটাস্ট্যাটিক বা শেষ পর্যায়ে গিয়ে শনাক্ত হচ্ছে। নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এ চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।
চিকিৎসকদের মতে, ৪৫ বছর বয়সের পর প্রস্রাবের অভ্যাস বা যৌন স্বাস্থ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধু বয়স বাড়ার স্বাভাবিক লক্ষণ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ইউরোলজি ও রোবোটিক ইউরোলজিক্যাল সার্জারির বিশেষজ্ঞ ডক্টর বিক্রম শর্মা জানিয়েছেন, অনেক পুরুষ প্রস্রাব বা যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতেও সংকোচ করেন। এর ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরুতে দেরি হয়।
প্রোস্টেটের সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বিশেষভাবে তিনটি লক্ষণের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রথমত, রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে নকচুরিয়া বলা হয়। অনেকেই এটিকে বেশি পানি পান বা বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন মনে করেন। তবে প্রোস্টেট বড় হয়ে মূত্রনালিতে চাপ সৃষ্টি করলে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে ঘুম বারবার ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ ধরনের লক্ষণ ক্যানসার নাকি প্রোস্টেটের অন্য কোনো সমস্যার কারণে হচ্ছে, তা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল বা ধীর হয়ে যাওয়া। প্রস্রাব শুরু করতে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, ধারা থেমে থেমে আসা কিংবা প্রস্রাব শেষ হওয়ার পরও ফোঁটা ফোঁটা পড়া মূত্রনালিতে বাধার ইঙ্গিত হতে পারে। প্রোস্টেটের কারণে দীর্ঘদিন মূত্রথলিতে প্রস্রাব জমে থাকলে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন, মূত্রথলিতে পাথর এবং কিডনির ক্ষতির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তৃতীয়ত, হঠাৎ বা দীর্ঘস্থায়ী যৌন অক্ষমতা। চিকিৎসকদের মতে, ইরেকটাইল ডিসফাংশনকে শুধু মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রোস্টেটের কাছাকাছি থাকা স্নায়ু ও রক্তনালিতে সমস্যা তৈরি হলে যৌন সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে যৌন অক্ষমতার অনেক কারণ থাকতে পারে এবং এটি একা প্রোস্টেট ক্যানসারের নিশ্চিত লক্ষণ নয়।
ডক্টর বিক্রম শর্মা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে যৌন সক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের ওষুধ নিজে থেকে গ্রহণ করলে মূল স্বাস্থ্য সমস্যাটি আড়ালে থেকে যেতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ৪৫ বছর বয়সের পর বিশেষ করে পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রোস্টেটের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। পিএসএ রক্ত পরীক্ষা ও ডিআরইসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার সুযোগও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
তাই বয়স বাড়ার স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে প্রস্রাব বা যৌন স্বাস্থ্যের অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্রুত রোগ শনাক্ত করাই প্রোস্টেট ক্যানসারসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।