ঢাকা , শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল) , ১ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
সংবাদ শিরোনাম :
নবম পে স্কেলে বেতন পেতে তথ্য দিতে হবে আইবাসে চীনে বাড়ছে পেট্রোল ডিজেলের দাম সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া সার বিক্রির অভিযোগ আওয়ামী লীগ আমলে ঋণের হিসাবেও গড়মিল হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী ইউরোপে গ্যাসের দাম ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৬ লাখ কোটি টাকা, শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তে জামায়াত সেক্রেটারির গভীর উদ্বেগ মিথ্যা ঘোষণায় চকবাজারের প্রতিষ্ঠানের সাড়ে পাঁচ হাজার কেজি প্রসাধনী আটক আত্মহত্যার হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার আহ্বান: স্বাস্থ্যমন্ত্রী নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষায় নিরাপত্তা বেড়া নির্মাণ করল ফিনল্যান্ড সেফটি ভালভ জটিলতা ও অগ্নিকাণ্ডে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলএনজি কিনছে পেট্রোবাংলা চাঁদপুরের ঐতিহাসিক বড় স্টেশন মাছঘাটে ইলিশের তীব্র সংকট ক্যাশলেস লেনদেন বাড়লে দুর্নীতি কমবে এবং ব্যবসার খরচ কমবে: অর্থমন্ত্রী উত্তরায় শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকার শপিং মলে ভয়াবহ আগুন হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনে দুর্ঘটনায় দুই সেনাসদস্য নিহত ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পাওনিয়ার বেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সার্ভে ইন্ডিয়ার ভূমিকা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারীর বিশ্লেষণে ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বে এএসআই-এর ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন।
নিউজটি শুনুন
  • আপলোড সময় : ১২-০৯-২০২৬ ১২:৫৪:০৮ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১২-০৯-২০২৬ ১২:৫৪:০৮ অপরাহ্ন
  • ৪ মিনিট পড়ার সময়
  • ২০ বার পঠিত
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সার্ভে ইন্ডিয়ার ভূমিকা ছবি: সংগৃহীত
ভারতীয় উপমহাদেশের অতীত ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে Archaeological Survey of India বা ASI একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা পরবর্তীকালে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করে।
 
এর কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, উৎখনন, শিলালিপি ও মুদ্রা গবেষণা, স্থাপত্য বিশ্লেষণ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ একটি সুসংগঠিত কাঠামো লাভ করে। প্রতিষ্ঠার সময় এর প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রাচীন নিদর্শন ও প্রত্নস্থল শনাক্ত করা; সময়ের সাথে সাথে দায়িত্ব বিস্তৃত হয়ে জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও গবেষণায় পরিণত হয়।
 
স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল প্রাচীন সাহিত্য, ভ্রমণবৃত্তান্ত ও মাঠপর্যায়ের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণকে সমন্বিত করে প্রাচীন স্থান শনাক্ত করার প্রচেষ্টা। বিশেষ করে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের বিবরণ ব্যবহার করে তিনি উত্তর ভারতের বহু প্রাচীন নগর ও বৌদ্ধ তীর্থস্থানের অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। এই পদ্ধতি লিখিত ইতিহাসের সাথে বস্তুগত প্রমাণের সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে ASI-এর জরিপ কার্যক্রম ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু প্রত্নস্থল প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিকভাবে নথিবদ্ধ হয়।
 
বিশ শতকের শুরুতে স্যার জন মার্শালের নেতৃত্বে ASI আরও সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। এই সময় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর উৎখনন সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্কে আধুনিক ধারণার বিকাশে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে ভারতীয় উপমহাদেশে নগরসভ্যতার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং এর নিজস্ব জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো ছিল। একই সময় তক্ষশিলা, সাঁচী, সারনাথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থানে গবেষণা ভারতীয় ধর্ম, শিল্প ও স্থাপত্যের ইতিহাস পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
 
প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন ASI-এর গবেষণার একটি প্রধান ক্ষেত্র। উৎখননের মাধ্যমে মাটির নিচে থাকা স্থাপত্য, মৃৎপাত্র, মুদ্রা, অলংকার, অস্ত্র, কৃষি সরঞ্জাম, সমাধি ও অন্যান্য বস্তুগত নিদর্শন উদ্ধার করা হয়। এসব নিদর্শনের স্তরবিন্যাস, উপাদান, নির্মাণপ্রযুক্তি ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে অতীত সমাজের জীবনযাত্রা ও কালক্রম সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা সম্ভব হয়। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ASI ১২১টি প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এতে বোঝা যায় যে প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠগবেষণা এখনও প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের আওতাভুক্ত।
 
শিলালিপি গবেষণায়ও ASI-এর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় শিলালিপি থেকে রাজবংশ, প্রশাসন, ভূমিদান, ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সামাজিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু তথ্য পাওয়া যায়। ASI-এর Epigraphy Branch বিভিন্ন ভাষা ও লিপিতে উৎকীর্ণ শিলালিপি সংগ্রহ, পাঠোদ্ধার, অনুবাদ ও প্রকাশের মাধ্যমে ইতিহাসের প্রাথমিক উৎসভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। একইভাবে মুদ্রাতত্ত্বের গবেষণা প্রাচীন অর্থনীতি, বাণিজ্য, রাজশক্তি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
 
স্থাপত্য গবেষণার ক্ষেত্রেও ASI দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বৌদ্ধ স্তূপ, হিন্দু ও জৈন মন্দির, গুহা, দুর্গ, মসজিদ, সমাধি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনার পরিকল্পনা, নির্মাণশৈলী, অলংকরণ ও উপকরণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় স্থাপত্যের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং সময়ের সাথে এর পরিবর্তন বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ASI-এর Annual Reports, Memoirs এবং বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রকাশনা এসব কাজের ফলাফল সংরক্ষণ করেছে এবং পরবর্তী গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস তৈরি করেছে।
 
প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণ ASI-এর আরেকটি মৌলিক দায়িত্ব। প্রাকৃতিক ক্ষয়, আর্দ্রতা, দূষণ, উদ্ভিদের বিস্তার, নগরায়ণ ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের কারণে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় ASI structural conservation-এর পাশাপাশি chemical conservation ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার কাজ করে থাকে। ১৯০৪ সালের Ancient Monuments Preservation Act এবং পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালের Ancient Monuments and Archaeological Sites and Remains Act এই সংরক্ষণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমানে ASI জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন কয়েক হাজার স্মারক ও প্রত্নস্থলের সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে।
 
গবেষণার ফলাফল জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ASI-এর ভূমিকা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলে site museum প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎখননে পাওয়া প্রত্নবস্তু ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ASI-এর অধীনে ৫০টিরও বেশি archaeological site museum রয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন ও ভার্চুয়াল প্রদর্শনের মতো আধুনিক উদ্যোগ প্রত্নঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করেছে।
 
তবে ASI-এর ইতিহাসকে সম্পূর্ণ সমালোচনামুক্তভাবে দেখা যায় না। ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এর প্রাথমিক গবেষণায় ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব ছিল। প্রাচীন ভারতকে শ্রেণিবদ্ধ ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো কখনো কখনো গবেষণাকে প্রভাবিত করেছে। স্বাধীনতার পর ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতার ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা আরও বহুমাত্রিক হয়েছে। বর্তমান সময়ে নগরায়ণ, অবৈধ নির্মাণ, পর্যটনের চাপ, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ ASI-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
 
সামগ্রিকভাবে Archaeological Survey of India ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় একটি মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে। জরিপ ও উৎখননের মাধ্যমে প্রত্নস্থল শনাক্তকরণ, শিলালিপি ও মুদ্রা গবেষণার মাধ্যমে ঐতিহাসিক উৎস সম্প্রসারণ, স্থাপত্য নথিবদ্ধকরণ এবং বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়ার অতীতকে গবেষণাযোগ্য ও সংরক্ষণযোগ্য ঐতিহ্যে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর পুরোনো জরিপ প্রতিবেদন ও প্রত্নতাত্ত্বিক নথি আজও ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার মূল্যবান উৎস। তাই ASI-এর অবদান কেবল ভারতের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়; দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও এর প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।