ইরানে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির সামরিক অভিযানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের পক্ষে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। একই প্রতিবেদনে ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের তদন্তে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাহারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলাকে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মিশনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হামলাটির জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী ছিল বলে বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণ তারা পেয়েছেন। তাদের মতে, স্কুলটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত বেসামরিক স্থাপনা ছিল এবং এটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন শিশু ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানকারীদের মতে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও সেখানে হামলা চালানো হয়ে থাকলে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে ইরানের লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া স্থাপনায় হামলার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ২২ জন বেসামরিক ব্যক্তি হতাহত হন এবং কাছাকাছি আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা হামলাটিকে নির্বিচার বলে উল্লেখ করে এটিকেও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
এসব হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে অস্বীকার করেছিল। তবে পরবর্তী অনুসন্ধানে মার্কিন বাহিনীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে। জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি তদন্তের বরাত দিয়ে জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ‘কেউ’ ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালায়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে মিনাবের প্রাণঘাতী হামলার জন্য সম্ভবত মার্কিন বাহিনী দায়ী বলে উঠে এসেছিল। তবে লামার্দে হামলার দিন সেখানে মার্কিন বাহিনী কোনো হামলা চালায়নি বলে মার্চে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল। দুটি ঘটনাতেই পেন্টাগনের তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
অন্যদিকে জাতিসংঘের একই প্রতিবেদনে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মোকাবিলায় বেআইনি হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে গ্রেফতার, জোরপূর্বক গুম এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ব্যাপক ও পদ্ধতিগত দমনপীড়নের অংশ হয়ে থাকতে পারে। এ কারণে এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।
ইরানি সরকারি হিসাবে, ওই বিক্ষোভে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৫ হাজার আহত হয়েছেন। তবে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের ধারণা, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশের কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। এ বিষয়ে জেনেভায় অবস্থিত দুই দেশের স্থায়ী দূতাবাস রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।