কলকাতার বুকে দীর্ঘ এক মাস ধরে খাবার পানি তীব্র হাহাকার। শহরের কাশীপুর এলাকার জ্যোতিনগর কলোনির প্রায় ৫,০০০ বাসিন্দা গত এক মাস ধরে এক ফোঁটা পানির জন্য লড়াই করছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিত্যদিনের কাজের জন্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয়দের গঙ্গা নদীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি অভিযোগ, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) 'সংখ্যালঘু বিরোধী রাজনীতি' এবং ভোট না দেওয়ার শাস্তিস্বরূপ পরিকল্পিতভাবে এই পানির কষ্ট তৈরি করা হয়েছে।
কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত জ্যোতিনগর কলোনি, যা স্থানীয়ভাবে 'মোল্লা পাড়া' নামেও পরিচিত। গত ৬০ বছর ধরে এখানে মূলত মুসলিমদের বাস, পাশাপাশি বেশ কিছু হিন্দু পরিবারও বসবাস করে। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ নির্মাণ শ্রমিক বা বোতল গলানোর কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
স্থানীয়রা জানান, গত ২৭ জুলাই কলকাতা পুরসভার কর্মীরা কলোনিতে পানির পাইপলাইনের মেরামতির কাজ করতে আসেন। ২৯ জুলাই কাজ শেষ হয় এবং বাসিন্দারা পানিও পান। কিন্তু ওইদিন রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ হঠাৎ করেই পানির সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। অভিযোগ, একই রাস্তার ধারে থাকা হিন্দু অধ্যুষিত কলোনিগুলোতে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও, মোল্লা পাড়ার ৬টি পানির কলই গত এক মাস ধরে শুকনো। এমনকি পরের দিন কলোনির রাস্তার আলোও নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
গঙ্গার ঘাটই এখন ভরসা, বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি ও রোগব্যাধি পানির অভাবে বাধ্য হয়ে বাসিন্দারা গঙ্গার ঘাটে যাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা জাহানারা বিবি আক্ষেপ করে বলেন, "ছোট ছোট বাচ্চারা মুখ ধুতে ঘাটে যাচ্ছে। অনেকেই গঙ্গায় পড়ে গেছে, কেউ কেউ অল্পের জন্য ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। যারা সাঁতার জানে না, তারাও বাধ্য হয়ে নদীতে স্নান করছে।"
গঙ্গার দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা এবং চর্মরোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। কাদামাখা পিচ্ছিল ঘাটে পা পিছলে অনেকেই মারাত্মক আহত হয়েছেন।
বিপাকে নারী ও শিক্ষার্থীরা, মসজিদে বন্ধ ওযু:
পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী ইসমা খাতুন জানায়, পানি অভাবে এবং পরীক্ষার সময়ে এই সঙ্কটের কারণে সে স্কুলে যেতে পারছে না। এলাকার স্কুলেও পানির সংযোগ নেই। পাশাপাশি রাস্তার আলো নিভিয়ে দেওয়ায় মহিলাদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে সে জানায়। পানির অভাবে স্থানীয় জামে মসজিদে ওযুর পানিও বন্ধ হয়ে গেছে।
এই সঙ্কটের পেছনে স্থানীয়রা সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে দায়ী করছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রিতেশ তিওয়ারির একটি ভাইরাল ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। যেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, যেসব সংখ্যালঘু তাঁকে ভোট দেননি, আগামী পাঁচ বছর তিনি তাঁদের জন্য কোনো কাজ করবেন না। স্থানীয়দের দাবি, বিধায়ক এখন নিজের সেই কথাই বাস্তবায়ন করছেন।
এছাড়া, বস্তি উচ্ছেদের গুঞ্জনও বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। অভিযোগ, স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা তাঁদের উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছেন।
প্রশাসনের উদাসীনতা ও বিকল্প ব্যবস্থা:
বাসিন্দারা জানান, তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুমন সিং-এর কোনো দেখা নেই। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ভোটের ফলাফলের পর তিনি এলাকা ছেড়েছেন। পুরসভা বা পুলিশের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে সিপিআই(এম) এবং পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতি প্রতি তিন-চার দিন অন্তর ৭০০ টাকা খরচ করে পুরসভার পানির ট্যাঙ্ক আনানোর ব্যবস্থা করেছে। তবে সিপিআই(এম)-এর স্থানীয় শাখা সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস জানান, "পাঁচ হাজার মানুষের জন্য তিন-চার দিন পর পর এক ট্যাঙ্ক পানি একেবারেই অপর্যাপ্ত।" বুধবার সিপিআই(এম)-এর উদ্যোগেই এলাকার রাস্তার আলো কিছুটা মেরামত করা হয়েছে।
সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
সাংবাদিক ও কলামিস্ট অর্ক ভাদুড়ি এই ঘটনাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য লজ্জাজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের সাথে যা হচ্ছে তা সংবিধান বিরোধী। তারা শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে এই অকল্পনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, কলকাতার সুশীল সমাজের নীরবতা আমাদের ভেতরের 'ইসলামোফোবিয়াকেই' চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে সিপিআই(এম) নেতা শামীম আহমাদের লড়াইয়ের ফলে বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে একটি স্থগিতাদেশ পাওয়া গেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও, এক মাস পেরিয়ে গেলেও মোল্লা পাড়ার পানির কলগুলো আজও শুকনো।
নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২
কাশীপুরের "মোল্লা পাড়া" দীর্ঘ এক মাস ধরে পানির তীব্র হাহাকার
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার কাশীপুর এলাকার জ্যোতিনগর কলোনিতে গত এক মাস ধরে তীব্র পানি সংকট চলছে, যার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংখ্যালঘু বিরোধিতার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিউজটি শুনুন
- আপলোড সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ১১:৩৮:১৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ১১:৩৮:১৯ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ২৬ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
সর্বশেষ সংবাদ
এ জাতীয় আরো খবর