দেশে শিশু নিখোঁজের এমন ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সরকারি হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৬ হাজার শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। নির্দিষ্ট হিসাবে এই সংখ্যা ১৫ হাজার ৯১৭। অর্থাৎ সাত মাসে গড়ে প্রতিদিন ৭৫টির বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে।
মাসে গড়ে দুই হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার এই পরিসংখ্যান শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে থানায় জিডি করা সব শিশু যে অপহরণের শিকার হয়েছে, এমন নয়। পরিবারের অগোচরে খেলতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া, গণপরিবহনে ভুল জায়গায় নেমে যাওয়া, পথ হারানো কিংবা অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রলোভন দেখিয়ে শিশু অপহরণের ঘটনাও ঘটছে।
নিখোঁজ হওয়া অনেক শিশুকে অবশ্য দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে কিছু শিশু দীর্ঘদিনেও পরিবারের কাছে ফিরে আসে না। রূপা ও হালিমার মতো অনেক শিশুর সন্ধান এখনো মেলেনি। ফলে নিখোঁজ শিশুদের একটি অংশ কোথায় যাচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন পরও কেন অনেকের সন্ধান মিলছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কে উদ্ধার অভিযানের ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। নিখোঁজের তথ্য যত দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, শিশুকে দ্রুত উদ্ধারের সম্ভাবনা তত বাড়ে।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর অনেক পরিবার প্রথমে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কাছে খোঁজ করে। পরে থানায় গিয়ে জিডি করে। এতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় পার হয়ে যায়। অথচ নিখোঁজ শিশুটি এরই মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে। ফলে শিশুটির সর্বশেষ অবস্থান, পরনের পোশাক, সঙ্গে থাকা ব্যক্তি কিংবা কোন যানবাহনে উঠেছিল, এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করা জরুরি।
নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে প্রযুক্তির ব্যবহারের সুফলও দেখা গেছে। পাঁচ বছরের মুসকান ও আট বছরের সাইফ অপহরণের পর ‘মুন অ্যালার্ট’ নম্বর ১৬২১৯ এবং বিলবোর্ডে তাদের ছবি ও তথ্য প্রচার করা হয়েছিল। পরে সদরঘাট এলাকায় শিশু দুটিকে রেখে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা। দ্রুত তথ্য প্রচারের মাধ্যমে কীভাবে একটি শিশুকে উদ্ধারে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়, এই ঘটনা তার একটি উদাহরণ।
আবার দীর্ঘদিন পরও কোনো কোনো শিশুর সন্ধান মেলে। নুরুন্নাহার নামের এক শিশুকে দীর্ঘ আট বছর পর স্বেচ্ছাসেবী একটি সংস্থার অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়। পরে তার মা ও স্বজনদের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটে। এমন ঘটনা নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের জন্য আশার আলো দেখালেও একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা শিশুদের অনুসন্ধানব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন সামনে আনে।
প্রায় ১৬ হাজার শিশুর নিখোঁজ হওয়ার জিডি হয়েছে। কিন্তু এই হিসাবের পাশাপাশি আরও কিছু তথ্য জানা জরুরি। কতজন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে, কতজন নিজেরাই পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, কতজন এখনো নিখোঁজ, কতটি ঘটনায় অপহরণের মামলা হয়েছে এবং কতটি ঘটনার তদন্ত শেষ হয়েছে, এসব তথ্য জানা গেলে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
শিশু নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। জনসমাগমপূর্ণ স্থান, বাজার, মেলা, পার্ক, বাসস্ট্যান্ড কিংবা রেলস্টেশনে শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বা কোনো ধরনের প্রলোভনের বিষয়েও অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।
তবে শুধু পারিবারিক সচেতনতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নিখোঁজের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া, আন্তঃথানা যোগাযোগ জোরদার করা, সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংগ্রহ করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিশু অনুসন্ধানব্যবস্থা আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া মানে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও থমকে যায়। একটি মা-বাবা প্রতিদিন অপেক্ষা করেন, হয়তো আজই সন্তান ফিরে আসবে। সেই অপেক্ষা কারও ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টায় শেষ হয়, কারও ক্ষেত্রে কয়েক মাসে, আবার কারও ক্ষেত্রে বছরের পর বছরেও শেষ হয় না।
তাই সাত মাসে প্রায় ১৬ হাজার শিশুর নিখোঁজ হওয়ার হিসাব শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি উদ্বেগ আর ফিরে পাওয়ার আকুল অপেক্ষা। এখন প্রশ্ন হলো, নিখোঁজ এসব শিশুর মধ্যে কতজন ঘরে ফিরেছে, কতজনের সন্ধান এখনো নেই এবং যাদের খোঁজ মিলছে না, তাদের ফিরিয়ে আনতে আর কতটা কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।