একসময় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন রাজশাহীর বাগমারার ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ। ডুপ্লেক্স বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি, ব্যবসা ও এনজিও গড়ে তোলার পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের পলাতক নেতাকর্মীদের আশ্রয় এবং সাংগঠনিক তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহী জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার নির্দেশনায় ফিরোজ এলাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে গিয়ে সাভারে একটি বাড়ি ভাড়া নেন। সেখানে নিজে থাকার পাশাপাশি বাগমারা থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস পর তিনি এলাকায় ফের যাতায়াত শুরু করেন এবং আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১২ আগস্ট দুপুরে ফিরোজের মালিকানাধীন বাগমারা সবুজ বাংলা লিমিটেড নামের এনজিও কার্যালয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের সহযোগী সোহেল রানা, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জাকিরুল ইসলাম সান্টুর ব্যক্তিগত সহকারী সাজেদুর রহমান, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত শহিদুল ইসলাম শহিদ, আমজাদ হোসেন এবং ছাত্রলীগকর্মী রেজোয়ান ও রাসেল উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। গোপন বৈঠকের খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালালে কয়েকজন পালিয়ে গেলেও ফিরোজকে আটক করা হয়।
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ফিরোজ বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তার সম্পদের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে। এলাকায় তিনি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং দুটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন। তার ব্যবসা ও এনজিওতেও কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফিরোজের সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে রয়েছেন ঝিকরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মানিক হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জলিল মাস্টার, ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র মালেক মণ্ডল এবং তাহেরপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানাসহ কয়েকজন নেতা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঝিকরা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফিরোজ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। নিজের ফেসবুক আইডিতেও তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে কয়েকটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। এর মধ্যে বাগমারা উপজেলা যুবলীগ নামের একটি পেজ থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ১২ আগস্ট গোপন বৈঠক চলাকালে ফিরোজকে গ্রেফতার করা হয়। ২৪ জুলাই ভবানীগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে ককটেল হামলার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি। ওই মামলায় ফিরোজকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার সহযোগীদের মধ্যে যারা নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ঝিকরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান রতন ফিরোজের সম্পদের উৎস এবং তার কথিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে নিয়ে ফিরোজ সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং ১৫ আগস্ট নাশকতার পরিকল্পনা ছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি।