ঢাকা , শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ , ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) , ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
সংবাদ শিরোনাম :
ইউক্রেনের ড্রোন ঠেকাতে রুশ জাহাজে খাঁচা ও পানির ট্যাংক! ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি ইরান সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারে হুতিদের ড্রোন হামলা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশনে নামছে বিহারের শিক্ষার্থীরা শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আগস্টে আসছে আরও ৫ কার্গো সাগর উত্তাল থাকায় ফিরে গেল এলএনজিবাহী জাহাজ ঢাবির ৯২ শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতার অভিযোগ বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রথম ঐতিহাসিক সফর যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কিম জং উনের 'গোপন আইটি বাহিনী' চাহিদার তুলনায় জোগান কম, নওগাঁয় তীব্র লোডশেডিংয়ে অচল শিল্প ও কৃষিকাজ নিঝুম দ্বীপের বালুতে মিলল মূল্যবান ভারী খনিজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর উন্মুক্ত হলো বান্দরবানের পর্যটন স্পট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার মধ্যে শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধের নির্দেশ জরুরি গ্যাসের চাহিদা মেটাতে আট কার্গো এলএনজিসহ চার প্রস্তাবের অনুমোদন ঢাবির শেখ মুজিবুর রহমান হলের দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক সিট বাতিল যুদ্ধোত্তর আফগানিস্তানে পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে লোডশেডিং পানামা খালে লাইন ভাঙতে এক জাহাজেরই খরচ হলো ৪০ লাখ ডলার ফেনীতে ৮ মাসে চুরি শতাধিক ট্রান্সফরমার, বাড়ছে সংকট কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দফায় দফায় আফটারশক

বৃষ্টি নাকি নগর ব্যবস্থাপনার ধস? নগরায়ণ ও জলবায়ু সংকটে ভাসছে বাংলাদেশ!

প্রকৃতির সঙ্গে নগরায়ণের ক্রমবর্ধমান অসামঞ্জস্যতা এবং দুর্বল পরিবেশ ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের শহরগুলোতে বর্ষার বৃষ্টি আশীর্বাদের বদলে এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারীর এক বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধে নগর জলাবদ্ধতার এই ত্রিবিধ সংকট তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই থমকে যাচ্ছে নগরজীবন।
নিউজটি শুনুন
  • আপলোড সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ০৭:৪৪:০৯ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ০৭:৪৪:০৯ পূর্বাহ্ন
  • ১৫ মিনিট পড়ার সময়
  • ৩২ বার পঠিত
বৃষ্টি নাকি নগর ব্যবস্থাপনার ধস? নগরায়ণ ও জলবায়ু সংকটে ভাসছে বাংলাদেশ! ছবি: সংগৃহীত
 
বাংলাদেশে বৃষ্টি সাধারণত জীবনের প্রতীক। কৃষির জন্য বৃষ্টি আশীর্বাদ, নদী-খাল-বিলের জন্য বৃষ্টি পুনর্জীবনের উৎস, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের জন্য বৃষ্টি অপরিহার্য। অথচ দেশের নগরবাসীর কাছে বর্ষার বৃষ্টি ক্রমেই একটি ভিন্ন অর্থ বহন করছে।
 
আকাশে মেঘ জমলেই অনেক শহরে যান চলাচল থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, সড়ক পানিতে ডুবে যায়, বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢোকে, নর্দমা উপচে পড়ে এবং কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি মিশে যায় পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্যের সাথে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি অনেক সময় একটি শহরের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমকে প্রায় অচল করে দিতে পারে।
 
এই বাস্তবতা কেবল অতিরিক্ত বৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের নগর জলাবদ্ধতা আসলে প্রকৃতি ও নগর ব্যবস্থাপনার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান অসামঞ্জস্যের দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারী ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ণ মাটি, জলাভূমি, খাল, নিম্নভূমি ও প্রাকৃতিক জলধারণের জায়গাগুলোকে ক্রমাগত সংকুচিত করছে।
 
এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত সড়ক ও আবাসিক উন্নয়ন, দুর্বল ড্রেনেজ অবকাঠামো, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, খাল-জলাশয় দখল, সংস্থাগুলোর দায়িত্বের বিভাজন, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা ও অব্যবস্থাপনা।
 
ফলে প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘কত বৃষ্টি হয়েছে’ তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, একটি শহর কতটুকু পানি গ্রহণ, ধারণ, পরিবহন ও নিষ্কাশন করতে পারে এবং সেই সক্ষমতার সাথে নগর সম্প্রসারণের গতি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও এগিয়েছে। বাংলাদেশের জলাবদ্ধতার প্রকৃত সংকট এখানেই।
 
বিশ্বব্যাংকের Greater Dhaka-সংক্রান্ত গবেষণায় ঢাকাকে জলবায়ু ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, নিম্নভূমি, নদী, খাল ও জলাভূমি যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখত, সেগুলোর ক্রমাগত ভরাট ও নগরায়ণের ফলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়েছে। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও ভারী ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা এই ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
 
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতাও বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপীয় ব্যবস্থার অংশ এবং এর বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিচু ও সমতল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় মিটারের কম উচ্চতায় অবস্থিত। ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাশন-সংকট নগরাঞ্চলের জন্য কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করেছে।
 
কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানকে দায়ী করে বাংলাদেশের নগর জলাবদ্ধতার পুরোপুরি ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একই বৃষ্টিপাতের পর একটি শহরের একটি অংশ দ্রুত পানি নিষ্কাশন করতে পারলেও অন্য অংশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা কয়েকদিন পর্যন্ত পানি আটকে থাকতে পারে। অর্থাৎ বৃষ্টির পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও নগরীর ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিষ্কাশনব্যবস্থা, জলাধার, পাম্পিং সক্ষমতা, খাল ও নদীর সাথে সংযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভূমির উচ্চতা জলাবদ্ধতার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করে।
 
ঢাকার ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯০৬ সালে ঢাকার জনসংখ্যা যেখানে প্রায় এক লাখ ছিল, ২০২০ সালে তা প্রায় ২০.২ মিলিয়নে পৌঁছায়। একই সময়ে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে জলাশয় ও নদীগুলো মারাত্মকভাবে দখল ও ভরাটের সম্মুখীন হয়েছে এবং প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই নথিতে ঢাকার প্রধান ড্রেনেজ খাল, নদী ও পুকুরের অবৈধ দখলকে প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
এই পরিবর্তনকে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সরল ফল হিসেবে দেখা যাবে না। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আবাসন, সড়ক, বাজার, শিল্প, পার্কিং, বাণিজ্যিক ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো। কিন্তু যদি এই সম্প্রসারণ এমন জায়গায় ঘটে যেখানে আগে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হতো অথবা সাময়িকভাবে জমা থাকত, তাহলে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে সংকটের মুখোমুখি হয়। কংক্রিট, পিচ ও অন্যান্য অপরিবেশ্য পৃষ্ঠের পরিমাণ বাড়লে বৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ কমে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি ড্রেন ও খালের দিকে ধাবিত হয়।
 
এখানেই নগরায়ণ ও জলাবদ্ধতার সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি জলাভূমি কেবল একটি ‘খালি জায়গা’ নয়। একটি খাল কেবল নৌযান বা বর্জ্য বহনের পথ নয়। একটি নিম্নভূমি কেবল ভবিষ্যৎ আবাসিক প্রকল্পের সম্ভাব্য জমি নয়। এগুলো নগরের প্রাকৃতিক জল ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোর অংশ। একটি শহর যখন এই জায়গাগুলোকে হারায়, তখন প্রকৃতপক্ষে সে নিজের জলধারণ ও জলনিষ্কাশন ক্ষমতার অংশটুকু হারায়।
 
বিশ্বব্যাংকের Greater Dhaka flood-risk বিশ্লেষণে স্যাটেলাইট তথ্যের ভিত্তিতে নগর জলাভূমির ধারাবাহিক পতন এবং নির্মিত এলাকার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের জলাবদ্ধতার কারণও এক নয় বলে দেখানো হয়েছে। কোথাও অতিবৃষ্টি প্রধান সমস্যা, কোথাও নদীর পানি, কোথাও নিষ্কাশন-জট, আবার কোথাও বাঁধ ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি আটকে থাকে। অর্থাৎ ঢাকার মতো একটি বৃহৎ নগরকে জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে একক কোনো সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায় না।
 
এই বাস্তবতা থেকেই ‘বৃষ্টি বনাম নগরায়ণ’ ধরনের সরল দ্বন্দ্বের সীমাবদ্ধতা বোঝা যায়। প্রকৃতপক্ষে বৃষ্টি এবং নগরায়ণ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন নগরায়ণ বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক গতিপথকে বিবেচনায় না নিয়ে পরিচালিত হয়। একটি শহরের পরিকল্পনা যদি তার ভূপ্রকৃতি, জলাধার, নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, নদী-খালের সংযোগ ও ভবিষ্যৎ বৃষ্টিপাতের প্রবণতাকে উপেক্ষা করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে সেই শহরের অবকাঠামো তার প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
 
জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ কঠিন বর্জ্য। ড্রেনের নকশা যত ভালোই হোক, তার মুখ যদি প্লাস্টিক, পলিথিন, ময়লা, নির্মাণবর্জ্য ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্যের কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই অবকাঠামোর কার্যকারিতা দ্রুত কমে যায়। একইভাবে খাল বা জলাধারের ধারণক্ষমতা পলি, আবর্জনা ও অবৈধ স্থাপনার কারণে কমে গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না। ফলে একটি সমস্যার সাথে আরেকটি সমস্যা যুক্ত হয়। দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জলাবদ্ধতাকে আরো বাড়ায়, জলাবদ্ধতা পরিবেশ দূষণ বাড়ায় এবং দূষিত পানি আবার জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
 
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক ঢাকার পানি দূষণ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। কর্মসূচিটির আওতায় নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্যানিটেশন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক একই সাথে বলেছে, বৃহত্তর ঢাকায় দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন শহরের বর্জ্য ও বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে।
 
এই পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নগর জলাবদ্ধতা আসলে কেবল পানি নিষ্কাশনের সমস্যা নয়। এটি একই সাথে পানি, বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন, ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, জনস্বাস্থ্য এবং স্থানীয় সরকারের সক্ষমতার সমস্যা। একটি ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না, যদি সেই ড্রেনে আবার বর্জ্য জমে। একটি খাল খনন করলেই সমাধান হবে না, যদি তার উজানে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ থাকে অথবা ভাটিতে নদীর সাথে সংযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। একটি পাম্প বসালেই সমাধান হবে না, যদি পাম্পের আগে পানি পৌঁছানোর নেটওয়ার্কই অপর্যাপ্ত থাকে।
 
এ কারণে বাংলাদেশের নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সংকটকে ত্রিমুখী বলা যায়। প্রথম মুখটি হলো প্রকৃতি ও জলবায়ুর পরিবর্তিত আচরণ। দ্বিতীয়টি হলো দ্রুত, ঘন এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। তৃতীয়টি হলো প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। এই তিনটি একসাথে কাজ করে বলেই জলাবদ্ধতা এত দীর্ঘস্থায়ী ও বারবার এর পুনরাবৃত্তি হয়।
 
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা এখানে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। তবে জলাবদ্ধতার প্রতিটি ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবেও যথাযথ নয়। কোনো নির্দিষ্ট দিনের অতিবৃষ্টির জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কতটা দায়ী, তা নির্ণয়ের জন্য event attribution বা সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কিন্তু বৃহত্তর প্রবণতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
 
IPCC-এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ভারী ও তীব্র বৃষ্টিপাতের মাত্রা ও ঘনত্ব বাড়ার প্রবল বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। একই সাথে নগরায়ণ যখন মাটির জল শোষণক্ষমতা কমায় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন চরম বৃষ্টির সাথে নগর বন্যার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।
 
অর্থাৎ ভবিষ্যতের সমস্যা শুধু ‘আরও বেশি বৃষ্টি’ নয়। বরং কম সময়ে বেশি বৃষ্টি, বৃষ্টির সময়ের পরিবর্তন, বৃষ্টির ঘটনাগুলোর অনিয়মিততা এবং একইসাথে নদী ও বৃষ্টির পানির চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নগর পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলবে। যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা কয়েক দশক আগে একটি নির্দিষ্ট বৃষ্টির মাত্রার জন্য নকশা করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে একই ব্যবস্থা যদি পরিবর্তিত বৃষ্টিপাতের ধরন সামাল দিতে না পারে, তাহলে জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি আরও বাড়তে পারে।
 
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ঢাকার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক মাত্রাও সামনে এনেছে। ২০১৫ সালের একটি বিশ্লেষণে ২০১৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জলাবদ্ধতার সম্ভাব্য ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনায় না নিয়েই প্রায় ১১০ বিলিয়ন টাকা হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছিল। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হওয়ার আগেই জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক মূল্য উল্লেখযোগ্য।
 
এই অর্থনৈতিক ক্ষতি কেবল রাস্তাঘাট মেরামতের খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। জলাবদ্ধতার সময় কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, গণপরিবহন ধীর হয়ে যায়, পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়, ছোট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং নিম্নআয়ের মানুষের দৈনিক আয় সরাসরি কমে যায়। একজন অফিসকর্মীর কয়েক ঘণ্টা দেরি যেমন ব্যক্তিগত অসুবিধা, একজন দিনমজুরের একই সময় কাজ না পাওয়া তার পরিবারের খাদ্যব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক বোঝা শ্রেণিভেদে সমান নয়।
 
সামাজিক বৈষম্যের এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মানুষ হয়তো উঁচু ভবন, ব্যক্তিগত গাড়ি, বিকল্প রাস্তা কিংবা বাসা থেকে কাজ করার সুযোগের মাধ্যমে জলাবদ্ধতার কিছু প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে পানি মানে অনেক সময় ঘরের ভেতরে পানি, আসবাব নষ্ট হওয়া, দূষিত পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির সমস্যা সৃষ্টি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি বিশ্লেষণে ঢাকার বিভিন্ন বস্তি এলাকায় মৌলিক স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। ২০১৮-২০২০ সালের একটি জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে সেখানে বলা হয়েছে, ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বস্তিগুলোর ৭১ শতাংশে যথাযথ ড্রেনেজ অবকাঠামো ছিল না এবং ৭৭ শতাংশে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা ছিল না।
 
এখানে জলাবদ্ধতা একটি পরিবেশগত সমস্যা থেকে জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নেয়। বৃষ্টির পানি যখন নর্দমা ও পয়োনিষ্কাশনের পানির সাথে মিশে যায়, তখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য রোগজীবাণুর বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘসময় জমে থাকা পানি মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। রাস্তার পানি যখন বর্জ্য ও নোংরা পানির সাথে মিশে যায়, তখন পথচারী, শিশু এবং নিম্নআয়ের বাসিন্দারা বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।
 
তবে জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত দৃশ্যমান পানির নিচে নয়, বরং নগর শাসনের কাঠামোর মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় একাধিক প্রতিষ্ঠান জড়িত। পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন, সড়ক, ড্রেন, খাল, বর্জ্য, ভূমি উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পর্কিত। যখন কোন স্থানে জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে কে দায়ী। কিন্তু বাস্তবে পানি কোন প্রশাসনিক সীমানা মানে না। একটি খাল একাধিক এলাকার মধ্য দিয়েও যেতে পারে।
 
এই প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনকে সমন্বয়হীনতা আরও জটিল করে তোলে। কোনো একটি সংস্থা নিজের দায়িত্বের অংশ সম্পন্ন করলেও যদি সামগ্রিক জলপ্রবাহের শৃঙ্খল কার্যকর না থাকে, তাহলে ফলাফল নগরবাসীর কাছে ব্যর্থতা হিসেবেই প্রতিভাত হয়। তাই জলাবদ্ধতার দায় কেবল একটি সিটি কর্পোরেশন, একটি পানি সংস্থা, একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিংবা সাধারণ নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার কাঠামোগত কারণ আড়ালেই থেকে যায়।
 
এর অর্থ অবশ্যই নাগরিকের দায় নেই এমন নয়। ড্রেনে বর্জ্য ফেলা, খাল দখল বা অপরিকল্পিত নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও বেসরকারি খাতের ভূমিকাও রয়েছে। কিন্তু নাগরিক আচরণও একটি বৃহত্তর নগর ব্যবস্থার অংশ। যদি বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়, যদি পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকে, যদি নির্মাণবর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে এবং আইন প্রয়োগ দুর্বল হয়, তাহলে শুধু নাগরিককে দায়ী করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
 
অন্যদিকে অবৈধ দখল ও জলাভূমি ভরাটের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার বা খাল যদি দীর্ঘসময় ধরে সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে এটি কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের বিষয় নয়; এটি পরিকল্পনা, অনুমোদন, তদারকি ও আইন প্রয়োগের সামগ্রিক সক্ষমতারও প্রশ্ন।
 
বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনায় তাই একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন: পানি নিষ্কাশনকে শুধু প্রকৌশল সমস্যা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে, পানি একটি নগর-পরিবেশগত ব্যবস্থা। বৃষ্টির পানি কোথায় পড়ছে, কোথায় জমছে, কোথা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, কোথায় মাটিতে ঢুকছে এবং শেষ পর্যন্ত কোন নদী বা জলাশয়ে যাচ্ছে, এই পুরো জলচক্রকে একসাথে বিবেচনা না করলে স্থায়ী সমাধান কখনোই সম্ভব নয়।
 
এই জায়গায় শহরের বিভিন্ন ধরনের নদী ও খাল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর মধ্যে সমন্বয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ড্রেন, কালভার্ট, পাম্প ও নালা প্রয়োজনীয়। কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি জলাভূমি, খাল, পার্ক, উন্মুক্ত জমি, বৃষ্টির পানি ধারণের স্থান এবং permeable surface-ও নগর অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া দরকার। একটি শহর যত বেশি পানি শোষণ ও সাময়িকভাবে ধরে রাখতে পারবে, তার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার ওপর তাৎক্ষণিক চাপও তত কমবে।
 
এ ধরনের ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে nature-based solutions, blue-green infrastructure এবং sponge-city approaches-এর সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর অর্থ হতে পারে বিদ্যমান খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে rainwater retention, ভবন ও রাস্তার নকশায় পানি শোষণের সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন আবাসিক প্রকল্পে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ অক্ষুণ্ণ রাখা। 
 
শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করাও যথেষ্ট নয়। ড্রেনের পানি ধারণক্ষমতা নির্ধারণের সময় ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনা করা দরকার। অতীতে যে rainfall intensity ব্যবহার করে কোনো ড্রেন নকশা করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে সেটি যথেষ্ট নাও হতে পারে। একই সাথে drainage master plan-কে land-use planning-এর সাথে যুক্ত করতে হবে। একটি এলাকায় নতুন আবাসিক বা বাণিজ্যিক প্রকল্প অনুমোদনের আগে সেখানে অতিরিক্ত runoff কতটা তৈরি হবে এবং বিদ্যমান নিষ্কাশনব্যবস্থা তা ধারণ করতে পারবে কি না, তা বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনায় আসা উচিত।
 
বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের অভিজ্ঞতাও দেখায় যে সমস্যাটি শুধু ঢাকার নয়। নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রেই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক নথিতে দেখা যায়, শহরের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক মোট এলাকার প্রায় অর্ধেককে কভার করে এবং বাড়তে থাকা বর্জ্যপানি বর্ষাকালে ঘন ঘন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। ২০২৬ সালের একটি প্রকল্পে নারায়ণগঞ্জের ড্রেনেজ উন্নয়ন, সবুজ জনপরিসর এবং নগর সেবার জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিকে একই পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে।
 
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নগর জলাবদ্ধতা সমাধান করতে হলে drainage, wastewater, solid waste, green space এবং urban governance-কে আলাদা প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত নগর পরিবেশব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
 
একই যুক্তি দেশের অন্যান্য শহরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ কিংবা ছোট পৌর শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণ এক নয়। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও নদীর পানি, কোথাও পাহাড়ি ঢল, কোথাও খালের সংকোচন, কোথাও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, আবার কোথাও অপরিকল্পিত রাস্তা ও আবাসিক উন্নয়ন প্রধান কারণ হতে পারে। ফলে ‘এক শহর, এক সমাধান’ ধরনের পদ্ধতি কার্যকর হবে না।
 
বাংলাদেশের নগর জলাবদ্ধতার ভবিষ্যৎ তাই নির্ধারিত হবে আমরা বৃষ্টিকে কীভাবে দেখি তার ওপরও। যদি বৃষ্টিকে শুধু একটি দুর্যোগ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে প্রতিবার বৃষ্টির পর জরুরি ভিত্তিতে পানি সরানোর চেষ্টা করা হবে। কিন্তু যদি বৃষ্টির পানিকে একটি সম্পদ এবং নগর জলচক্রের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে পরিকল্পনার লক্ষ্য বদলে যাবে। পানি যত দ্রুত সম্ভব শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ধারণ, শোষণ, পুনঃব্যবহার এবং নিরাপদ নিষ্কাশনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে লক্ষ্য।
 
এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের মতো পানিপ্রধান দেশে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ paradoxically, যে দেশে পানির প্রাচুর্য রয়েছে, সেই দেশেই নগরবাসী একদিকে জলাবদ্ধতায় ডুবে যায় এবং অন্যদিকে নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলা করে। ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও এই দ্বৈত সংকটকে প্রকাশ করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার পানি সরবরাহের প্রায় ৮৭ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি থেকে আসে এবং অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে। একই সাথে অপর্যাপ্ত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
 
অর্থাৎ যে বৃষ্টির পানি শহর থেকে দ্রুত বের করে দেওয়ার জন্য আমরা ব্যস্ত, তার একটি অংশ যদি নিরাপদভাবে মাটিতে প্রবেশ করানো যেত, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে ভূমিকা রাখতে পারত। এই জায়গায় জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা ও পানি নিরাপত্তা একই সমস্যার দুটি দিক হয়ে ওঠে।
 
ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এই সংযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একদিকে চরম বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘ শুষ্ক সময় ও পানির চাহিদাও নগর ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে শহরের পানি ব্যবস্থাপনা শুধু বর্ষায় পানি সরানোর পরিকল্পনা হতে পারে না। বর্ষা, শুষ্ক মৌসুম, ভূগর্ভস্থ পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য, জলাভূমি এবং নদীকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
 
এক্ষেত্রে প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্যাটেলাইট, GIS, digital elevation model, rainfall radar, real-time water-level sensors এবং নাগরিক-ভিত্তিক reporting ব্যবস্থার মাধ্যমে কোথায় কত দ্রুত পানি জমছে, কোন ড্রেন বন্ধ, কোন খালের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত এবং কোন এলাকায় অতিরিক্ত runoff তৈরি হচ্ছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তি নিজে কোনো সমাধান নয়। তথ্য তখনই মূল্যবান হয় যখন তা পরিকল্পনা, বাজেট, রক্ষণাবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগের সাথে যুক্ত হয়।
 
বাংলাদেশের নগর জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই: এটি কোনো একক প্রকৌশলগত ব্যর্থতা নয়, আবার কোনো একক প্রাকৃতিক দুর্যোগও নয়। এটি একটি cumulative failure, যেখানে দীর্ঘদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত একত্র হয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে। একটি খাল একটু সংকুচিত হয়েছে, একটি জলাশয় ভরাট হয়েছে, একটি ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি, একটি রাস্তা এমনভাবে উঁচু করা হয়েছে যে পাশের এলাকা নিচু হয়ে গেছে, কোথাও বর্জ্য জমেছে, কোথাও অপরিকল্পিত ভবন তৈরি হয়েছে এবং একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন বৃষ্টির চরিত্রকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও সম্মিলিত ফলাফল বিশাল।
 
তাই ‘দোষ কার’ প্রশ্নের সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো, দায় একক কারও নয়, কিন্তু দায়িত্বও কারও নয় এমন নয়। নগর পরিকল্পনাকারী, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, পানি ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ ও জলসম্পদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ খাত, ভূমি মালিক, নাগরিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবাই কোনো না কোনো পর্যায়ে এই ব্যবস্থার অংশ। তবে দায়িত্বের মাত্রা সমান নয়। যাদের হাতে পরিকল্পনা, অনুমোদন, নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, তাদের দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
 
বাংলাদেশের নগর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য তাই জলাবদ্ধতাকে ‘বর্ষাকালের সাময়িক সমস্যা’ হিসেবে দেখা বন্ধ করা জরুরি। এটি নগরের সহনশীলতা, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং শাসনব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি সূচক। একটি শহর বৃষ্টির পর কত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে, তার মধ্যেই সেই শহরের পরিকল্পনার মান, অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি বড় অংশ প্রকাশ পায়।
 
বৃষ্টিকে থামানো সম্ভব নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সব প্রভাবও স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বৃষ্টির পানি কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, কোথায় শোষিত হবে এবং কোথায় নিরাপদে নিষ্কাশিত হবে, সেটি অনেকাংশেই মানুষের পরিকল্পনার বিষয়। তাই বাংলাদেশের নগর জলাবদ্ধতার ভবিষ্যৎ প্রকৃতির হাতে পুরোপুরি নির্ধারিত নয়; বরং তা নির্ধারিত হবে আমরা নগরকে কীভাবে নির্মাণ ও পরিচালনা করি তার ওপর।
 
একটি জলাভূমি রক্ষা করা মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা করা নয়, ভবিষ্যতের ড্রেনেজ অবকাঠামোর ওপর চাপ কমানো। একটি খাল পুনরুদ্ধার করা মানে শুধু নান্দনিকতা বাড়ানো নয়, নগরের জলপ্রবাহ পুনঃস্থাপন করা। একটি পার্কে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা মানে শুধু সবুজায়ন নয়, নগরের জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একটি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা মানে শুধু পরিচ্ছন্নতা নয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা রক্ষা করা। আর একটি কার্যকর নগর সরকার মানে শুধু রাস্তা ও ভবন নির্মাণ নয়, নগরের প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম অবকাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখা।
 
সুতরাং বাংলাদেশের জলাবদ্ধতার সংকটকে যদি কেবল ‘অতিরিক্ত বৃষ্টি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে সমস্যার অর্ধেকও বোঝা হবে না। আবার সব দায় নগরায়ণের ওপর চাপিয়েও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না। প্রকৃত সত্যটি মাঝখানে নয়, বরং এই দুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরে। দ্রুত নগরায়ণ যখন প্রাকৃতিক জলব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন যখন ভারী বৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়, তখন দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা সেই দুই চাপকে একটি সংকটে রূপ দেয়।
 
বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্নটি আর ‘বৃষ্টি কেন এত বেশি?’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, যে বৃষ্টি এই দেশের নদী, কৃষি ও জীবনের জন্য অপরিহার্য, সেই বৃষ্টিকে আমরা কেন শহরের জন্য বিপর্যয়ে পরিণত হতে দিচ্ছি?
 
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বড় ড্রেন নির্মাণ, আরও পাম্প স্থাপন কিংবা আরও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় পাওয়া যাবে না। উত্তর খুঁজতে হবে নগরের ভূপ্রকৃতি, জলাভূমি, নদী-খাল, ভূমি ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু বিজ্ঞান, প্রকৌশল, অর্থনীতি এবং নগর শাসনের সমন্বিত বাস্তবতায়। বাংলাদেশের নগর ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই জলবায়ু-সহনশীল করতে হয়, তবে বৃষ্টির বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, বৃষ্টির সাথে সহাবস্থানের পরিকল্পনাই হতে হবে লক্ষ্য।
 
কারণ শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধতা শুধু রাস্তায় জমে থাকা পানি নয়। এটি একটি শহর তার নিজস্ব জলপ্রবাহকে কতটা বুঝতে পেরেছে, প্রকৃতিকে কতটা জায়গা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা দূরদর্শী পরিকল্পনা করেছে, তারই এক নির্মম বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নগরগুলোকে এখন নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর সময় এসেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।