হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ইব্রাহিম খলিলের কক্ষে থাকা দুই অতিথির বিরুদ্ধে ‘সমকামী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে এ পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়।
ঘটনার পর উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে। দুই পক্ষের দাবি, সংঘর্ষে তাদের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
‘সমকামী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগের ভিত্তিতে হল প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম চলাকালে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে প্রথমে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে তা ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
ঘটনা সম্পর্কে শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোছাদ্দিক আল হক (শান্ত) গণমাধ্যমকে বলেন, সমকামিতাকে প্রমোট করতে গিয়ে ছাত্রশিবির বিভিন্নভাবে এজিএসকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে এবং এ জন্য নানাভাবে মিথ্যাচার করছে। তার দাবি, আগের দিন সিসিটিভির ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে, যাতে ওই সময় এজিএস সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা প্রমাণ করা না যায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ধরনের মিথ্যাচারের মাধ্যমে ছাত্রশিবির নিজেদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
তার ভাষ্য, একপর্যায়ে প্রভোস্ট অফিসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও সেখানে অবস্থান নেন। পরে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। তখন তারা বাইরে ছিলেন। পরে ভেতরে প্রবেশ করলে আবারও তাদের ওপর হামলা হয়। এতে ছাত্রদলের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
অন্যদিকে, ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলে শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তৌকির হাসান বলেন, রোববার দুপুর আড়াইটায় হল প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির ডাকে তদন্তে অংশ নিতে এজিএস ও তার রুমমেট প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে যান। তদন্ত শুরু হওয়ার পরপরই ছাত্রদলের দুই সদস্য বৈঠক চলাকালে কক্ষে প্রবেশ করেন। পরে বিষয়টি দেখতে তিনি নিজেও প্রভোস্টের কার্যালয়ে যান। সেখানে উপস্থিত হাউস টিউটররা সবাইকে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন।
তৌকির হাসান আরও বলেন, এরপর ছাত্রদলের সদস্যরা প্রভোস্ট অফিসের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তারা অভিযোগ তোলেন, ছাত্রশিবিরের এক সদস্য তাদের ছবি তুলেছেন। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওই সদস্যের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে তারা প্রভোস্টের কক্ষে আশ্রয় নেন। সেখানে কী ঘটছে, তা ধারণের জন্য আবার ভিডিও করা হলে সেটিকে কেন্দ্র করেও ছাত্রদলের সদস্যরা পুনরায় হামলা চালান। ঘটনাস্থলে পাঁচজন হাউস টিউটর উপস্থিত থাকলেও তাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলার একপর্যায়ে সহকারী প্রক্টর নূর আলম সিদ্দিকী এসে বলেন, ছাত্রদলের সদস্যরা রাগের মাথায় হামলা করছেন। কিন্তু সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থেকে এমন বক্তব্য দেওয়া অনুচিত ছিল।
ঘটনার পর শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূঞা তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করেছেন বলে দাবি করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল।
তবে তিনি পদত্যাগ করেননি বলে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুন্সী শামসুদ্দিন আহমেদ এবং প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন।
প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের গুঞ্জন সম্পর্কে প্রক্টর স্টার নিউজকে বলেন, উভয় পক্ষই তার শিক্ষার্থী। তার সামনেই এমন ঘটনা ঘটায় তিনি ক্ষুব্ধ ও মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন। তবে তিনি পদত্যাগ করেননি এবং এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্তের কথাও প্রশাসনকে জানাননি।
ঘটনা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন গণমাধ্যমকে বলেন, শহীদুল্লাহ হলে দুই পক্ষের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। হল প্রাধ্যক্ষ বিষয়টি জানালে সঙ্গে সঙ্গে সহকারী প্রক্টরদের নিয়ে একটি মোবাইল টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। বর্তমানে ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম চলছে।
ঘটনার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল বের করে ছাত্রশিবির। মিছিলটি মধুর ক্যান্টিন থেকে ভিসি চত্বর হয়ে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে একটি সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খান বলেন, ‘ছাত্রলীগের চেহারায় ছাত্রদলকে দেখা যাচ্ছে। যদি তা না হতো, তবে শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্টের কক্ষে ছাত্রদলের কাজ কী ছিল? ছাত্রদল প্রভোস্টের কক্ষে ঢুকে হামলা চালিয়েছে। প্রভোস্টের উচিত ছিল বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু তিনি দলের লোক হওয়ায় কিছু বলতে পারেননি—এ কারণেই পদত্যাগ করেছেন।’
ছাত্রশিবিরের প্রতিবাদ মিছিলের কিছু সময় পরই এর প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করে ছাত্রদলের একাংশ।
উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই শহীদুল্লাহ হল সংসদের এজিএস ইব্রাহিম খলিলের কক্ষে তার দুই অতিথিকে ‘সমকামী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত অবস্থায় আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেলে হল প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
এ ঘটনায় মৌখিকভাবে এজিএস ইব্রাহিম খলিলের হলের আসন (সিট) বাতিল করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে হল সংসদের জিএস তৌকির হাসান বলেন, প্রভোস্ট ছাত্রদলের সদস্যদের ডেকে জানিয়েছেন যে এজিএসের সিট বাতিল করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনে তাকে পাওয়া যায়নি।
ডেস্ক রিপোর্ট