আরমিন ইসলাম অর্থী শিক্ষার্থী
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছেই একজন অভিভাবক তার সন্তানকে পাঠান শিশুর সেই ছোট্ট মস্তিষ্কে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, আদব-আখলাকের মতো বিষয়গুলোর পাঠ নেওয়ার জন্য। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর প্রজন্মকে গড়ে তোলার এক বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য একজন শিক্ষককে নানা বিষয় খেয়াল রাখতে হয়, মেনে চলতে হয়। এমনি কিছু বিষয় যেগুলো একজন শিক্ষকের খেয়াল রাখা উচিত, তা নিচে তুলে ধরা হলো-
ধৈর্যের সাথে কাজ করা:
একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীকে পড়ানো আর একজন শৈশবে অবস্থান করা বাচ্চাকে পড়ানো কখনোই এক নয়। শিশুদেরকে বোঝানোর জন্য, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেশ ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। তাই এটি এমন একটি গুণ যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের বকাঝকা না করা:
কখনো কখনো একজন শিশু শিক্ষকের অবাধ্য হতে পারে, কথা না শুনতে পারে। কিন্তু শিশুকে বকাঝকা করা, সকলের সামনে তাকে অপমান করা এর সমাধান নয়। বরং শিশুকে বুঝিয়ে, তার ভুল শুধরে দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া:
একেকজন শিক্ষার্থীর পড়া আয়ত্ত করার দক্ষতা একেক রকম। কোনো শিক্ষার্থীকে তাই পড়া না পারার কারণে তিরস্কার করা বা অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। বরং এক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে যার মাধ্যমে পড়াশোনা নামক বিষয়টি শিশুর কাছে আনন্দদায়ক হয়ে উঠে এবং শিশু নিজে থেকেই পড়া আয়ত্ত করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠে। পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে শিশু পড়ালেখা থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে এবং পড়াশোনা শিশুর কাছে ভয়ের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
শ্রেণিক্ষের বদলে কোচিং কে প্রাধান্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা:
কোনো কোনো শিক্ষক আছেন যারা শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে না পড়িয়ে কোচিং করানোর বিষয়টিকে প্রাধান্য দেন। কখনো কখনো পরীক্ষায় যেসকল প্রশ্ন আসবে সেগুলো কোচিং এ বলে দেওয়া হয়। এছাড়া কোচিং এ পড়ে, এমন শিক্ষার্থীকে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও দেখা যায় কখনো কখনো। এই বিষয়গুলো চরম নীতিহীনতার বহিঃপ্রকাশ। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের কার্যক্রম কখনোই কাম্য নয়। বরং একজন শিক্ষক এই কাজগুলো করার মাধ্যমে মূলত নিজের সম্মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন। এ ধরনের কার্যক্রম পরিলক্ষিত হলে শিক্ষার্থীদের উচিত, কর্তৃপক্ষকে অবগত করা।
প্রহার করার বিষয়ে সতর্ক থাকা:
একজন শিশু যখন কোনো ভুল করে তখন শিক্ষকের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, শিশুর ভুল ধরিয়ে দিয়ে তাকে সঠিক বিষয়টি শেখানোর জন্য। তবে এক্ষেত্রে যে বিষয়টি মনে রাখা প্রয়োজন তা হলো, অতিরিক্ত এবং অস্বাভাবিক প্রহার শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিক্ষকদের উচিত শিশুকে বুঝিয়ে কিংবা তার অভিভাবককে অবগত করার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া।
বিদ্যালয়কে শিশুর কাছে আনন্দদায়ক করে তোলা:
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে বিদ্যালয়ে আসা শিশুর কাছে একটি আনন্দের বিষয়ে পরিণত হয়। ক্লাস করা, পড়া চর্চা করা এবং শিক্ষককে পড়া দেওয়া- এই বিষয়গুলো যাতে শিশুর কাছে বিরক্তিকর বা ভীতিকর হয়ে না উঠে, তা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষকদের সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে খেলাচ্ছলে শিশুদের কাছ থেকে পড়া আদায় করা, যে ভালোমতো পড়া দিতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করার মতো নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
খেলার ছলে শেখানো: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন শিশুরা স্বভাবতই খেলাধুলা করতে পছন্দ করে। তাই শিক্ষকদের উচিত পড়ালেখাকে শুধু শ্রেণিক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুদেরকে খেলার মাধ্যমেও শেখানোর ব্যবস্থা করা। শিখন পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনার মাধ্যমে সহজেই শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়।
একজন শিশুকে অন্য একজন শিশুর সাথে তুলনা না করা:
শিশুকে অন্য একজন শিশুর সাথে তুলনা করলে সে অপমানিত বোধ করতে পারে। এতে করে শিশুটি হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে। পাশাপাশি শিশুর মাঝে আত্নবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে। আর একজন মানুষের সফলতার জন্য আত্ববিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো শিশুকে যার সাথে তুলনা করা হচ্ছে, তার প্রতি শিশুর মনে বিদ্বেষ তৈরি হতে পারে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে শিশুদের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয় যা কখনোই কাম্য নয়।
অভিভাবকের সাথে কথা বলে সমাধান:
যখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, শিশুকে বোঝাতে চাইলেও সে বুঝতে চাইছে না- তখন অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করে সমাধানে আসা সম্ভব। অর্থাৎ এক্ষেত্রে শিশুর সমস্যাটি মা-বাবা'র কাছে তুলে ধরা এবং সম্ভাব্য সমাধানগুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
তবে এক্ষেত্রে মা-বাবাকেও সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আলোচনার জন্য আহ্বান করা হলে বিষয়টিকে নেতিবাচক ভাবে নেওয়া যাবে না, সন্তানকে বকাঝকা করা যাবে না। বরং শিশুর কী সমস্যা হচ্ছে, তা খুঁজে বের করে তা সমাধানের জন্য সচেষ্ট হতে হবে।
পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো-মন্দের শিক্ষা দেওয়া:
শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে যে বয়সের মধ্য দিয়ে যায়, ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝানোর জন্য সেই সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষকদের এই বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিশুর মধ্যে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার মতো দক্ষতাও তৈরি হয়। শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই শিশু যাতে লেখাপড়ার পাশাপাশি একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
ইসলামী শিক্ষা দেওয়া:
আল্লাহ তাআলাকে চেনা, নবী-রাসূল সম্পর্কে জানা এবং নিজের জীবনের লক্ষ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য ইসলাম শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর শৈশব থেকেই এই শিক্ষা দেওয়া শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তিকে মজবুত করে তোলে। তাই এই বিষয়ে সচেতন হওয়া শিক্ষকদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব সঠিক ইসলামী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে শিশুর জীবনকে সুন্দর করে তোলা।
অন্যায়ের সাথে আপস না করার শিক্ষা দেওয়া:
শৈশব থেকেই শিশুকে এই শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন যে, যাতে সে অন্যায়ের সাথে, জুলুমের সাথে আপস না করে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন শিশুদেরকে অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি অন্যায়কে মেনে না নেওয়ার পাঠও দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে শিক্ষকদের রাখতে হবে আগ্রণী ভূমিকা।
সব ধরনের নীতিহীন কাজ থেকে বিরত থাকা:
শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তাদের সামনে থাকা মানুষটির আচরণ দ্বারা তারা প্রভাবিত হয় এবং তাদের অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তাই শিক্ষকদের উচিত শিশুদের সামনে সর্বদা অনুকরণীয় আচরণ করা। কেননা তাদের নীতিহীন কোনো কাজ সহজেই শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকদের সমন্বয়ে আলোচনা সভার আয়োজন:
শিশুদের পড়াশোনা সহ নানা বিষয়ে
আলোচনা করার জন্য শিক্ষকদের মধ্যে আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। এখানে শিক্ষকগণ নিজ নিজ শ্রেণির অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একে অপরকে পরামর্শ দিতে পারেন। এই পরামর্শের ভিত্তিতে বিদ্যালয়ে শিশুদের কল্যাণার্থে কোনো নতুন সিদ্ধান্তও গৃহীত হতে পারে।
শিক্ষক-অভিভাবক সভায় অভিভাবকদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ :
শিক্ষকদের উচিত এই সভায় শিশুদের অবস্থা প্রকৃতভাবে অভিভাবকদের কাছে তুলে ধরা। "শিক্ষক-অভিভাবক সভা", অভিভাবক কর্তৃক শিশুর অগ্রগতি যাচাই এর জন্য কার্যকর একটি উপায়। এই সভার মাধ্যমে অভিভাবকদের সাথে শিক্ষকদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হয়। শিশু শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী কি না, খাতায় ঠিকভাবে লিখছে কি না, পড়া দিতে পারছে কি না- ইত্যাদি নানা বিষয় প্রত্যক্ষভাবে শিক্ষকদের নিকট থেকে অভিভাবকগণ জেনে নিতে পারেন। বিদ্যালয়ে যদি এ ধরনের সভা আয়োজনের প্রচলন না থাকে তবে শিক্ষকদের উচিত প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে কথা বলে, অনন্ত প্রতি ৬ মাসে ১ দিন হলেও এই সভার আয়োজন করা।
সর্বোপরি আদর্শ শিক্ষক হয়ে উঠার জন্য নানা বিষয়ে একজন মানুষকে সচেতন হতে হয়। তাই এক্ষেত্রে কর্তব্য হলো শিশুর মনস্তত্ব বোঝা সহ নানা গুণাবলি নিজের মধ্যে ধারণ করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করে যাওয়ার মানসিকতা লালন করা।