প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত পরিমিত ও অ হস্তক্ষেপমূলক নীতি অনুসরণ করে। তবে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং তারেক রহমানের সরকার গঠনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে কমিটি মনে করছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে টেলিফোনে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তিনি নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে দেন এবং সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। কমিটির মতে, এই কূটনৈতিক উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে অমীমাংসিত বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়েও প্রতিবেদনে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানবিক বিবেচনা এবং ভারতের দীর্ঘদিনের আশ্রয়দানের নীতির আলোকে তাকে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতের ভূখণ্ড রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ নেই। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ প্রচলিত আইন ও আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনাধীন রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের মার্চে মোংলা বন্দর উন্নয়নে ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্পে চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এছাড়া ভারতের সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি চীনের সহায়তায় উন্নয়ন এবং পেকুয়ায় চীনের সহযোগিতায় নির্মিত সাবমেরিন ঘাঁটিকেও ভারতের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ভারত সরকারকে বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভারতের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছর শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করে তা নবায়নকে দুই দেশের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বর্ণনা করেছে কমিটি। এ লক্ষ্যে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে শিগগিরই এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য ও সমতাভিত্তিক সমাধানে পৌঁছানোর আগ্রহের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ টহল জোরদারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও আগস্টে দুই বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রমকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতীয় কর্মীদের প্রত্যাহারের পর ভিসা কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের পাঁচটি ভিসা কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার ভিসা দেওয়া হচ্ছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ চিকিৎসাসংক্রান্ত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি।
ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়েও পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৫ ও ৬ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ২৩তম এলওসি পর্যালোচনা বৈঠকে উভয় পক্ষের সম্মতিতে প্রাক বাস্তবায়ন পর্যায়ের ১২টি প্রকল্প বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে চলমান আটটি প্রকল্প দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাকেও প্রতিবেদনে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৮ মে পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর ২ হাজার ৪৪৬টি হামলার তথ্য কমিটির নজরে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি।
বাণিজ্য প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে সাফটার আওতায় ভারতে অধিকাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। তবে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই সুবিধা শেষ হতে পারে। তাই দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আলোচনা দ্রুত শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট