ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৬শে মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক প্রতীক। এই দিনটি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার সূচনালগ্ন হিসেবে চিহ্নিত, যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক দমননীতি এবং অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অদম্য প্রতিরোধ। মহান স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় সেই উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপটে, যেখানে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতার অনিবার্য দাবি।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও পূর্ব বাংলার জনগণ খুব দ্রুতই বুঝতে পারে যে, নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেও তাদের অধিকার সুরক্ষিত নয়। পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে ক্রমাগতভাবে বঞ্চিত করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি, এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান; এই প্রতিটি ঘটনা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিতকে সুদৃঢ় করে তোলে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” নামে নির্মম গণহত্যা শুরু করে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, যা কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনিবার্য করে তোলে।
এই সংকটময় মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জায়গা তৈরি করেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়।
তবে, চট্টগ্রামে অবস্থানরত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান, যিনি তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর ছিলেন, তিনি ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটি “আমি মেজর জিয়া বলছি…” দিয়ে শুরু হয়েছিল, যা দেশ-বিদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণার গুরুত্ব নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও, এটি অস্বীকার করা যায় না যে তার কণ্ঠে প্রচারিত ঘোষণাটি যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সাহস ও দিকনির্দেশনা জুগিয়েছিল। বিশেষ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সেই সময়ে একটি সুসংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই ঘোষণার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিয়াউর রহমান ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে নবগঠিত “জেড ফোর্স”-এর অধিনায়ক হন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সামরিক সংগঠক, যিনি সীমিত সম্পদ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যুদ্ধ পরিচালনায় সক্ষমতা দেখাতে পেরেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে এবং ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলের পরে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” ধারণার প্রবর্তন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে তার শাসনামল নিয়ে যেমন প্রশংসা রয়েছে, তেমনি সমালোচনাও রয়েছে; বিশেষ করে সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক আছে।
২৬শে মার্চের স্বাধীনতা দিবস তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা নয়; এটি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ইতিহাসের প্রতিফলন। এখানে যেমন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রয়েছে, তেমনি জিয়াউর রহমানসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ ও অবদানও রয়েছে। ইতিহাসের এই অধ্যায়কে মূল্যায়ন করতে হলে আবেগ নয়, বরং তথ্যনির্ভর এবং বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন।
আজকের প্রজন্মের জন্য স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুনভাবে অনুধাবন করা জরুরি। এটি শুধু অতীতের গৌরবগাথা স্মরণ করার দিন নয়, বরং স্বাধীনতার মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। একই সাথে ইতিহাসের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান জানিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় চেতনা গড়ে তোলাও সময়ের দাবি।
আলোচনার সবশেষে বলা যায়, ২৬শে মার্চ আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও জীবনের ভিত্তি। এই দিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং জিয়াউর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বদের ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন আমাদের ইতিহাসচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ ও পরিপূর্ণ করে। একটি জাতি হিসেবে নিজেদের অতীতকে যত গভীরভাবে বুঝতে পারবো, ততই আমরা ভবিষ্যতের পথচলায় দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী হতে পারবো।
নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২