ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রোগ নিয়ন্ত্রণে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা দিয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচির মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নাগরিকদের সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছিল।
২০০০ সালের পর থেকে ডেঙ্গু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রোগের প্রকোপ বাড়লে সরকারি সংস্থাগুলো তৎপর হয় এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়। তবে প্রকোপ কমে যাওয়ার পর এসব সুপারিশ অনেক ক্ষেত্রে আর যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।
২০১৭ সালে দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগতত্ত্ববিদ ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে ঢাকায় পাঠায়। ঢাকা ছাড়ার আগে তিনি ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা দলিল তৈরি করে দেন। ‘মিড টার্ম প্ল্যান ফর কন্ট্রোলিং অ্যান্ড প্রিভেন্টিং এডিস বোর্ন ডেঙ্গু অ্যান্ড চিকুনগুনিয়া ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই পরিকল্পনায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের হার এবং ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর দুটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পরিকল্পনায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ণয় এবং রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মূল্যায়নের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে একটি র্যাপিড রেসপন্স টিম গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে ১২টি মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরে দলিলটি যথাযথভাবে কাজে লাগাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৯ সালে দেশে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালকে ঢাকায় পাঠায়। তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এডিস মশার বৈশিষ্ট্য এবং তা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে পরামর্শ দেন।
নাগপালের মতে, এডিস মশা ডিম পাড়ার পর এক বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। কোনো পাত্রে থাকা ডিম এক বছর পর পানির সংস্পর্শে এলে সেখান থেকে মশা জন্মাতে পারে। এডিস মশা সাধারণত নর্দমায় ডিম পাড়ে না। বরং ছোট ছোট পানির আধার তাদের প্রজননের জন্য বেশি উপযোগী।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন নাগপাল। তাঁর বক্তব্য ছিল, শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ কর্মীরা সব বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না। অথচ এডিস মশা ঘরের অন্ধকার ও আর্দ্র জায়গায়, যেমন টেবিল, চেয়ার, সোফা ও বিছানার নিচে কিংবা পর্দা ও আলমারির পেছনে অবস্থান করতে পারে। তাই বাড়ির ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার রাখা নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সম্প্রতি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে সরকার। ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তিন মাসব্যাপী এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ডেঙ্গুর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুরোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের নিয়মিত সম্পৃক্ততা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।